
বয়স মাত্র ১৮ মাস। যে বয়সে একটি শিশু সবে হাঁটতে শেখে, আধো আধো বোলে কথা বলার চেষ্টা করে ঠিক সেই বয়সেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজের নাম লিখিয়েছে খাগড়াছড়ির শিশু মোহাম্মদ শেহেজাদ বিন খলিল।
কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ ছাড়াই ইংরেজি ভাষায় কথা বলার দক্ষতা অর্জন করে ইতিমধ্যে সবাইকে চমকে দিয়েছে সে। শুধু ইংরেজি নয়, মাতৃভাষা বাংলার পাশাপাশি এই বয়সেই সে আয়ত্ত করেছে সূরা ইয়াসিন, আরবি হরফ পরিচিতি (আলিফ-বা-তা-ছা), বাংলা স্বরবর্ণ (অ-আ-ই-ঈ), ইংরেজি বর্ণমালা (এবিসি) এবং কবিতা আবৃত্তি।
এই অসাধারণ কৃতিত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ শিশুটি পেয়েছে মর্যাদাপূর্ণ ‘এশিয়া বুক অব রেকর্ডস’ এর ‘গ্র্যান্ড মাস্টার’ খেতাব। স্কুলজীবন শুরু হতে এখনো অনেক দেরি থাকলেও এই বয়সেই বিশ্ব রেকর্ড গড়ে পরিবার ও দেশের জন্য বিরল সম্মান বয়ে এনেছে সে। বিস্ময় বালক শেহজাদের এই অনন্য অর্জনে উচ্ছ্বসিত পরিবার, স্বজন ও এলাকাবাসী। তার সাফল্যের খবর এখন মুখে মুখে ফিরছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এই কৃতিত্ব কেবল তার পরিবারের জন্য নয়, গোটা বাংলাদেশের জন্যও এক গর্বের বিষয়।
২০২৩ সালের ১০ অক্টোবর খাগড়াছড়ি সদর উপজেলার মাইনী ভ্যালীতে মো. ইব্রাহিম খলিল ও তানিয়া আক্তার দম্পতির ঘরে জন্ম নেয় মোহাম্মদ শেহেজাদ বিন খলিল। জেলা শহরে জন্ম নিলেও তার পৈতৃক নিবাস প্রতিবেশী উপজেলা মাটিরাঙ্গায়। পেশাগত জীবনে ইব্রাহিম খলিল একজন সফল ফ্রিল্যান্সার, অনেক সংগ্রাম ও প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে জীবনের পথচলা শুরু করেছিলেন ইব্রাহিম। নানা বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে আজ তিনি একজন সফল ফ্রিল্যান্সার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। কঠোর পরিশ্রম, অধ্যবসায় ও অদম্য ইচ্ছাশক্তির মাধ্যমে তিনি সাফল্যের এই অবস্থানে পৌঁছেছেন।
তার এই সফলতার যাত্রায় পাশে রয়েছেন তাঁর সহধর্মিণী তানিয়া খলিল। তিনিও একজন দক্ষ ফ্রিল্যান্সার। পারস্পরিক সহযোগিতা, পরিশ্রম ও আত্মবিশ্বাসের মাধ্যমে তারা দুজনই নিজেদের কর্মজীবনে সাফল্যের স্বাক্ষর রেখে চলেছেন।
ফ্রিল্যান্সিং এর পাশাপাশি সন্তানের প্রতি বাড়তি সময় ও মনোযোগ দেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন এই দম্পতি, যা শেহেজাদের ভাষাগত বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করেন তারা।
শেহেজাদের বাবা মো. ইব্রাহিম খলিল জানান, ছেলের বয়স যখন মাত্র ছয় মাস, তখনই তার মধ্যে ব্যতিক্রমী বুদ্ধিমত্তার আভাস পান তারা। এরপর খেলাধুলা ও আনন্দের মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে তাকে পরিচয় করানো হয় ইংরেজি ভাষার সঙ্গে। কোনো ধরনের চাপ কিংবা মুখস্থবিদ্যার আশ্রয় না নিয়ে ছবি, খেলনা এবং দৈনন্দিন ব্যবহার্য বিভিন্ন জিনিসের সাহায্যে তাকে শেখানো হতো নতুন নতুন শব্দ।
এভাবেই একসময় ঘরের প্রায় সব জিনিসের নাম ইংরেজিতে বলতে শিখে ফেলে শেহেজাদ। এর পাশাপাশি ফল, ফুল, পশু-পাখি, যানবাহনসহ বিভিন্ন বস্তুর নামও অনায়াসে বলতে শুরু করে সে। একই সময়ে বাংলা ভাষাতেও কথা বলা রপ্ত করে ফেলে এই খুদে প্রতিভা।
সন্তানের এই অসামান্য ভাষাগত দক্ষতাকে আন্তর্জাতিক পরিসরে তুলে ধরতে বাবা-মা আবেদন করেন ‘এশিয়া বুক অব রেকর্ডস’-এর কিডস প্রোগ্রামে। এ জন্য জমা দেওয়া হয় শেহেজাদের ইংরেজিতে কথা বলার আটটি ভিডিও। এশিয়ার বিভিন্ন দেশ থেকে অংশ নেওয়া প্রতিযোগীদের সঙ্গে কঠোর যাচাই-বাছাই শেষে বিচারকরা শেহেজাদকে ভূষিত করেন ‘গ্র্যান্ড মাস্টার’ স্বীকৃতিতে। এই সাফল্যে উচ্ছ্বসিত পুরো পরিবার।
ছেলে শেহেজাদকে নিয়ে আবেগাপ্লুত মা তানিয়া আক্তার বলেন, "এটি শুধু আমার সন্তানের সাফল্য নয়, এটি বাংলাদেশেরও সম্মান। মা হিসেবে আমার একমাত্র চাওয়া আমার ছেলে যেন বড় হয়ে একজন ভালো মানুষ হয়ে উঠতে পারে।"
শেহজাদের বাবা ইব্রাহিম খলিল বলেন, ভবিষ্যতে ছেলেকে ইংরেজি মাধ্যমে উচ্চশিক্ষার সুযোগ করে দেওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের ক্ষেত্রও তৈরি করতে চান তিনি। সন্তানের মেধা ও প্রতিভার বিকাশে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতা ও অনুপ্রেরণা দিয়ে পাশে থাকার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।
এ বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে মাটিরাঙ্গা প্রেস ক্লাবের সভাপতি মো.জসিম উদ্দিন জয়নাল
বলেন, "এই বয়সে এমন অর্জন সত্যিই বিরল ও অনুপ্রেরণাদায়ক। শিশু শেহজাদের এই সাফল্য শুধু তার পরিবার নয়, গোটা খাগড়াছড়িবাসীর জন্যও গর্বের বিষয়। আমরা তার সুস্থ ও উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ কামনা করছি এবং প্রত্যাশা করছি, ভবিষ্যতেও সে দেশের জন্য এমন সম্মান বয়ে আনবে।"
খুদে শেহেজাদের এই আন্তর্জাতিক সাফল্যে গর্বিত খাগড়াছড়িবাসী। তার সাফল্যের পরিধি আরও বিস্তৃত হোক এবং ইব্রাহিম-তানিয়া দম্পতির স্বপ্ন পূরণ হোক এটাই সবার প্রত্যাশা।