
নাটোরের বড়াইগ্রামে নির্মাণাধীন একটি পাওয়ার গ্রিড সাব-স্টেশনে সংঘবদ্ধ ডাকাতির ঘটনায় বিপুল পরিমাণ মালামাল লুট হয়েছে। অস্ত্রের মুখে পাহারাদারদের জিম্মি করে প্রায় দুই কোটি টাকার সরঞ্জাম নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা, যা স্থানীয়ভাবে ব্যাপক উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
বুধবার (২৬ মার্চ) সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা থেকে রাত প্রায় ১টা পর্যন্ত উপজেলার জোয়াড়ী ইউনিয়নের কাছুটিয়া খেজুরতলা এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। সাব-স্টেশনে দায়িত্বে থাকা চারজন নিরাপত্তাকর্মীকে বেঁধে রেখে লুটপাট চালানো হয়। খবর পেয়ে বৃহস্পতিবার সকালে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম) সুমন কুমার এবং বড়াইগ্রাম সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শোভন চন্দ্র হোড় ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।
সাব-স্টেশনের উপ-সহকারী প্রকৌশলী আনাস আলী জানান, বিদ্যুৎ বিভাগের আওতায় পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসি (পিজিবিসি) এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। বর্তমানে সেখানে সিভিল নির্মাণ ও বৈদ্যুতিক স্থাপনার কাজ চলছিল। নিরাপত্তার জন্য চারজন পাহারাদার সার্বক্ষণিক দায়িত্বে ছিলেন। বৈদ্যুতিক কাজের দায়িত্বে রয়েছে চায়না ন্যাশনাল ওয়্যার অ্যান্ড ক্যাবল ইমপোর্ট এক্সপোর্ট কর্পোরেশন (সিসি কোম্পানি)।
চীনা প্রতিষ্ঠানের স্থানীয় প্রতিনিধি প্রকৌশলী সোলায়মান আলী জানান, ডাকাতরা ৩৬৮টি ব্যাটারি (মূল্য প্রায় ১ কোটি ১৩ লাখ টাকা), দুই হাজার মিটার তামার তার (প্রায় ৫৩ লাখ টাকা) এবং অন্যান্য সরঞ্জাম (২৬ লাখ ৬০ হাজার ২৮৯ টাকা) নিয়ে যায়। সব মিলিয়ে লুট হওয়া মালামালের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ৯২ লাখ ৬০ হাজার ২৮৯ টাকা। তিনি আরও বলেন, ঘটনাস্থলের দুটি সিসি ক্যামেরার হার্ডডিস্ক খুলে নেওয়া হয়েছে এবং পাহারাদারদের মোবাইল ফোনও ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে।
ঘটনার বর্ণনায় পাহারাদার মকছেদ আলী (৪২) বলেন, “আমিসহ আমার সঙ্গে আবুল কাশেম (৫৫), শফিকুল ইসলাম (৪৮) ও তার ছেলে সোহাগ (২৪) এখানে পাহারাদারের কাজ করি। আমরা সবাই কাছুটিয়াসহ আশেপাশের গ্রামের বাসিন্দা। বুধবার সন্ধ্যায় আমরা সবাই ডিউটিতে ছিলাম। সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে শফিকুল খেতে যায়। ১৫-২০ মিনিট পরে নক করলে গেট খুলে দেই। এ সময় হঠাৎ পেছন থেকে ৫-৬ জন লোক শফিকুলের কলার ধরে ভিতরে নিয়ে আব্দুস সাত্তার নামে একজনকে খুঁজতে থাকে। এ সময় আমরা সাত্তার নামে কেউ নেই জানালে তারা ঘরে চেক করার নামে আমাদের চারজনকেই ডেকে নিয়ে আসে। পরে আরও ১৫-২০ জন লোক ভেতরে ঢুকে। এক পর্যায়ে তারা অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে আমাদের হাত, মুখ, চোখ ও পা বেঁধে ফেলে।”
আরেক পাহারাদার আবুল কাশেম বলেন, “আমাদেরকে একটি ঘরের ভেতরে আটকে রাখে। এরপরে সাব স্টেশনের ভেতরে গাড়ি ঢোকা এবং বিভিন্ন কাজ করার শব্দ পাই। প্রায় রাত একটা পর্যন্ত তারা এসব করেছে। পরে বেশ কিছুক্ষণ শব্দ না পেয়ে অনেক চেষ্টা করে সোহাগ প্রথমে নিজেকে মুক্ত করে অন্য সবার বাঁধন খুলে দেয়। পরে আমরা জানালার পর্দার স্ট্যান্ড দিয়ে ছিটকানি খুলে ভোর সাড়ে ৪টার দিকে বের হই। এরপর আমরা বাইরে গিয়ে একজনের মোবাইল নিয়ে ৯৯৯-এ এবং আমাদের স্যারদের কল করে জানাই।”
নাটোর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২ এর জেনারেল ম্যানেজার প্রকৌশলী মাহবুবুর রশীদ বলেন, সাব-স্টেশনটির কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে ছিল। এটি চালু হলে বড়াইগ্রাম, গুরুদাসপুর, নাটোর সদর, লালপুর ও বাগাতিপাড়া উপজেলায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হতো। আগামী জুনে উদ্বোধনের পরিকল্পনা থাকলেও এই ঘটনার পর নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
বড়াইগ্রাম থানার ওসি আব্দুস ছালাম জানান, পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে এবং মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে। ঘটনার রহস্য উদঘাটনে গোয়েন্দা পুলিশের দলও কাজ শুরু করেছে। জড়িতদের গ্রেপ্তার ও লুট হওয়া মালামাল উদ্ধারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।