.jpeg)
পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন জনপদের নাম ‘চন্দ্রদ্বীপ’। তেঁতুলিয়া নদীর উত্তাল ঢেউয়ের ওপারে চর ব্যারেট, চর রায়সাহেব, চর মিয়াজান, মধ্য মিয়াজান, চর দিয়ারা, চর কচুয়া, চর ওয়াডেল, চর নিমদি, চর ফ্যাডা রওশন, চর আলগী ও ভাড়ানীর চরসহ ১১টি গ্রাম নিয়ে গড়ে ওঠা এই দ্বীপে বসবাস প্রায় ৩০ হাজার মানুষের।
সবুজে ঘেরা এই জনপদ কৃষি ও মৎস্যসম্পদে সমৃদ্ধ হলেও আড়ালে লুকিয়ে আছে ভয়াবহ এক বাস্তবতা। এখানে অসুস্থ হওয়া মানেই অনিশ্চিত পরিণতি। আধুনিক চিকিৎসা এখনো এই জনপদের মানুষের কাছে বিলাসিতা।
বাউফল সদর থেকে প্রায় ২২ কিলোমিটার দূরের এই দ্বীপে পৌঁছানোর একমাত্র উপায় ইঞ্জিনচালিত নৌকা। সাধারণ সময়ে যাত্রা কষ্টকর হলেও সম্ভব, কিন্তু জরুরি মুহূর্তে সেটিই হয়ে ওঠে মৃত্যুর ফাঁদ। প্রসূতি মা, স্ট্রোক কিংবা হৃদরোগে আক্রান্ত রোগী, যে-ই হোক, তাকে বাঁচাতে হলে পাড়ি দিতে হয় উত্তাল তেঁতুলিয়া নদী। এতে সময় লাগে প্রায় দেড় ঘণ্টা। আর এই সময়টুকুই অনেকের জীবনের শেষ সময় হয়ে দাঁড়ায়।
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, প্রতি বছর গড়ে ৫ থেকে ৭ জন মানুষ শুধু চিকিৎসা না পেয়ে অথবা হাসপাতালে নেওয়ার আগেই মারা যাচ্ছেন। বর্ষা বা দুর্যোগে যখন নৌ চলাচল বন্ধ থাকে, তখন সেই সংখ্যা আরও বাড়ে। অথচ এসব মৃত্যুর কোনো সরকারি হিসাব নেই।
সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী একটি ইউনিয়নে একটি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র (ইউএইচঅ্যান্ডএফডব্লিউসি), প্রতি ৬ হাজার জনসংখ্যার জন্য একটি কমিউনিটি ক্লিনিক এবং ২০ হাজার মানুষের জন্য কমপক্ষে তিনটি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র থাকার কথা। প্রতিটি কমিউনিটি ক্লিনিকে কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার (সিএইচসিপি), স্বাস্থ্য সহকারী (এইচএ), পরিবার কল্যাণ সহকারী (এফডব্লিউএ), পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা (এফডব্লিউভি), নিয়মিত টিকাদান (ইপিআই), মাতৃ-শিশু স্বাস্থ্যসেবা, পরিবার পরিকল্পনা, প্রাথমিক চিকিৎসা এবং মিডওয়াইফের মাধ্যমে নিরাপদ প্রসবসেবা নিশ্চিত করার কথা থাকলেও চন্দ্রদ্বীপে বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন।
২০১৩ সালে ছোট-বড় ১৫টি চর ও ১১টি গ্রাম নিয়ে ইউনিয়ন গঠিত হলেও ১৯৯৮ সালে স্থাপিত একটি মাত্র কমিউনিটি ক্লিনিক ছাড়া এখানে আর কোনো স্বাস্থ্যসেবা অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি। বর্তমানে সেই ক্লিনিকটিও জনবল সংকটে কার্যত অচল হয়ে জরাজীর্ণ ও চিকিৎসার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী যেখানে একাধিক স্বাস্থ্যকর্মী থাকার কথা, সেখানে একজন সিএইচসিপি ছাড়া বাকি সব পদই শূন্য। চলতি বছরের শুরু থেকে গত চার মাস ধরে সরকারি ওষুধ সরবরাহও বন্ধ রয়েছে। ফলে কাগজে স্বাস্থ্যসেবা থাকলেও বাস্তবে পুরো ইউনিয়ন কার্যত চিকিৎসাবিহীন।
চর ওয়াডেল গ্রামের ৭৫ বছর বয়সী নুরজাহান বেগম বলেন, ‘আমার এ বয়সে অনেকবার দেখেছি, প্রসূতি মা কিংবা দুর্ঘটনার শিকার রোগীকে সময়মতো হাসপাতালে নিতে না পারার কারণে মাঝনদীতেই সব শেষ হয়ে গেছে। গত মাসেই জমিজমা নিয়ে সংঘর্ষে আহত কালাইয়া ইউপির উজ্জ্বল কর্মকারকে হাসপাতালে নেওয়ার পথে মাঝনদীতেই মারা যেতে হয়েছে। এই অভিশপ্ত বিচ্ছিন্নতা আমাদের আর কত প্রাণ কেড়ে নেবে জানি না।’
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে সন্তান জন্মদানের সময় বা পরে অন্তত ২৭টি শিশুসহ ৩০ থেকে ৩৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। ২০২৩ সালে চর মিয়াজান গ্রামের লিমা আক্তার ঝুমুর সন্তান প্রসবের সময় মারা যান। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে চর ওয়াডেলের মালেক মাঝি ও বিদ্যুৎকর্মী হাসনাইনকে হাসপাতালে নেওয়ার পথে প্রাণ হারাতে হয়। স্থানীয়দের মতে, এগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এই জনপদের প্রতিদিনের বাস্তবতা।
স্থানীয় বিউটি বেগম বলেন, ‘বর্তমান যুগে ৩০ হাজার মানুষের জন্য একটি কার্যকর স্বাস্থ্যকেন্দ্র না থাকা শুধু অবহেলা নয়, বড় ধরনের প্রশাসনিক ব্যর্থতা।’
জহিরুল ইসলাম সোহাগ বলেন, ‘এখানে অসুস্থ হওয়া মানেই মৃত্যুঝুঁকি। বছরে ৫ থেকে ৭টি মৃত্যু যেন স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। এই মৃত্যুর দায় কে নেবে?’
চর ওয়াডেল কমিউনিটি ক্লিনিকের সিএইচসিপি সিদ্দিকুর রহমান বলেন, ‘এই এলাকায় অন্তত আরও দুটি কমিউনিটি ক্লিনিক, একটি ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র, ১০ শয্যার একটি হাসপাতাল এবং একটি ওয়াটার অ্যাম্বুলেন্স জরুরি প্রয়োজন।’
তিনি আরও জানান, ২০১৩ সাল থেকে একাধিকবার আবেদন করা হলেও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।
একই ক্লিনিকের স্বাস্থ্য সহকারী সোলাইমান বলেন, ‘যেখানে ৬ জন স্বাস্থ্য সহকারী থাকার কথা, সেখানে আমি একাই কাজ করছি। ওষুধের চাহিদা জনসংখ্যার তুলনায় অনেক কম হওয়ায় রোগীদের প্রাথমিক চিকিৎসা ও ওষুধ দেওয়া সম্ভব হয় না। ২৪টি আউটরিচ টিকাদান কেন্দ্রে ৬ জন মাঠকর্মী থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে একজনও নেই।’
তিনি আরও বলেন, ‘একজন স্বাস্থ্যকর্মী দিয়ে পুরো ইউনিয়ন কভার করা অসম্ভব। অনেক সময় মসজিদের মাইকিং করে মানুষ জড়ো করতে হয়, তাতেও বাধার সম্মুখীন হতে হয়।’
চন্দ্রদ্বীপ ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আবুল বসার মৃধা বলেন, ‘আমরা উপজেলার বিভিন্ন সভা-সেমিনারে বারবার দাবি জানিয়েছি এবং দুটি কমিউনিটি ক্লিনিক ও একটি সরকারি হাই-স্পিড বোটের আবেদন করেছি।’
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ আব্দুর রউফ বলেন, ‘একটি ক্লিনিক ছাড়া পুরো ইউনিয়নে কোনো স্বাস্থ্যকেন্দ্র নেই, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।’
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সালেহ আহমেদ বলেন, ‘সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী প্রতিটি ইউনিয়নে স্বাস্থ্যকেন্দ্র থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে অনেক জায়গায় তা গড়ে ওঠেনি। উপজেলার বেশ কয়েকটি ইউনিয়নে নতুন ভবন নির্মাণ জরুরি হয়ে পড়েছে এবং পুরোনো ভবনগুলো জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে চিঠি পাঠানো হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।’
জনবল সংকট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘স্বাস্থ্য খাতে জনবল ঘাটতি একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তবে নতুন সরকার এ বিষয়ে গুরুত্ব দিচ্ছে। খুব দ্রুতই প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ হবে বলে আশা করছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘এলাকার ভৌগোলিক বাস্তবতা বিবেচনায় একটি ১০ শয্যার হাসপাতাল অত্যন্ত প্রয়োজন। এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি ওয়াটার অ্যাম্বুলেন্স চালুর জন্য বিশেষ বরাদ্দের চেষ্টা চলছে।’
পটুয়াখালী জেলা সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ খালেদুর রহমান মিয়া বলেন, ‘চন্দ্রদ্বীপের মতো দুর্গম এলাকায় বছরে অন্তত দুই মাস ভাসমান হাসপাতাল সেবা চালু থাকে। তবে গত চার মাস ধরে ওষুধ সরবরাহ বন্ধ থাকার বিষয়টি সত্য।’
তিনি বলেন, ‘কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো ট্রাস্ট বা প্রকল্পের আওতায় পরিচালিত হওয়ায় সব কার্যক্রম সরাসরি তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকে না। জনবল ঘাটতির বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে এবং তা পূরণের চেষ্টা চলছে।’
তেঁতুলিয়া নদীবেষ্টিত এই জনপদে এখনো চিকিৎসা মানে ভাগ্যের ওপর নির্ভরতা। এখানে অসুস্থ হওয়া মানেই সময়ের সঙ্গে দৌড়, আর সেই দৌড়ে প্রতিনিয়ত হারছে মানুষ।
স্থানীয়দের দাবি, অন্তত দুইজন মিডওয়াইফ, দুটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র, একটি পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র, ১০ শয্যার হাসপাতাল এবং একটি ওয়াটার অ্যাম্বুলেন্স জরুরি ভিত্তিতে স্থাপন করা হোক। ৩০ হাজার মানুষের এই জনপদ কি শুধুই নীতিমালার কাগজে থাকবে, নাকি বাস্তবেও পৌঁছাবে স্বাস্থ্যসেবা, সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো খুঁজছে তেঁতুলিয়ার ঢেউ।