
প্রচণ্ড ভ্যাপসা গরমে এক মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা লাগাতার লোডশেডিংয়ে অতিষ্ঠ হয়ে অবশেষে রাস্তায় নেমে এসেছেন নীলফামারীর সৈয়দপুরের অবাঙালি ক্যাম্পের বাসিন্দারা। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সংযোগের দাবিতে বুধবার (৩ জুন) সকাল থেকে চেয়ার-টেবিল ও আসবাবপত্র নিয়ে প্রধান সড়ক অবরোধ করে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা বসে থাকেন শত শত ক্ষুব্ধ নারী-পুরুষ।
এদিন সকাল থেকে সৈয়দপুর শহরের গোলাহাট এলাকার ১, ২ ও ৩ নম্বর ক্যাম্পের বাসিন্দারা একযোগে এই অবরোধ কর্মসূচি শুরু করেন। পরবর্তীতে বেলা দেড়টার দিকে বিদ্যুৎ সরবরাহকারী সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছ থেকে আশ্বস্ত হওয়ার পর তারা সড়ক থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নেন।
বুধবার দুপুরে সরেজমিনে দেখা যায়, শত শত উত্তেজিত আন্দোলনকারী রাস্তায় বসে বিক্ষোভ প্রদর্শন করছেন। এর ফলে সৈয়দপুর শহরের অন্যতম ব্যস্ত তামান্না টু ওয়াপদা সড়কের গোলাহাট অংশে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। শত শত যানবাহন আটকা পড়ায় চরম ভোগান্তিতে পড়েন সাধারণ পথচারী ও যাত্রীরা, যা নিয়ে অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
ভোগান্তির বিবরণ দিয়ে গোলাহাট ২ নম্বর ক্যাম্পের বাসিন্দা জসিম, বাবু, সাইরুন, ওয়াজিরন ও শাহিনসহ অন্যান্যরা জানান, "গত এক মাস ধরে প্রতিদিন সকাল ৬টার দিকে বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে এবং বিকেল ৪টা বা ৫টার দিকে আবার আসতেছে। বিদ্যুৎ এলেও ঘন ঘন লোডশেডিং চলতে থাকে।" তারা আরও বলেন, "এই ভ্যাপসা গরমে বসবাস করা কষ্টকর হয়ে উঠেছে। ঘনবসতিপূর্ণ ক্যাম্পে অনেক বয়স্ক মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। শিশুরাও হাঁসফাঁস করছে। আমরা এর সুষ্ঠু সমাধান চাই।"
১ নম্বর ক্যাম্পের বাসিন্দা সারওয়ারী, হাসিবুন ও নিয়াজসহ ক্ষুব্ধ অন্যান্যরা জানান, তারা শখ করে বা ইচ্ছাকৃতভাবে সড়কে নামেননি; বরং পরিস্থিতির শিকার হয়ে আন্দোলন করতে বাধ্য হয়েছেন। তাদের ভাষ্য, "সৈয়দপুর শহরে ২৩টি অবাঙালি ক্যাম্প রয়েছে। কিন্তু বিদ্যুতের এই সমস্যা শুধু গোলাহাট ক্যাম্পেই কেন? অন্য ক্যাম্পগুলোতে তো এমন সমস্যা নেই। তাহলে আমাদের বিদ্যুৎহীন রাখা হচ্ছে কেন? আমরা এর সঠিক জবাব চাই।"
আন্দোলনে অংশ নেওয়া আকবর, সিয়াম, রশিদ, হালিমা ও জরিনা বেগমসহ বাকিদের অভিযোগ, "ভোটের সময় আমাদের গুরুত্ব বাড়ে। তখন সবাই নানা প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোট চাইতে আসে। কিন্তু এই দুর্ভোগের সময়ে কাউকে পাশে পাওয়া যাচ্ছে না। বিদ্যুৎ না থাকায় আমাদের ঘরে ঘরে বয়স্ক মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। তাই আমরা এই প্রখর রোদেও আন্দোলন করছি।"
অন্যদিকে, দীর্ঘ সময় ধরে অবরোধে আটকে থাকা জিয়ারুল ও ফারুকসহ একাধিক সাধারণ যাত্রী অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, "এভাবে সাধারণ মানুষকে ভোগান্তিতে ফেলে দাবি আদায় করা উচিত নয়। জরুরি কাজে বের হয়েছি, কিন্তু সড়ক বন্ধ থাকায় গন্তব্যে যেতে পারছি না। যার কাছে দাবি, তার কাছেই তা উপস্থাপন করা উচিত। সড়ক অবরোধ করে জনগণকে জিম্মি করা গ্রহণযোগ্য নয়।"
উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে ক্যাম্প উন্নয়ন কমিটির সভাপতি মাজিদ ইকবাল বলেন, "এ বিষয়ে বিদ্যুৎ বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আমাদের আলোচনা হয়েছে। তারা জানিয়েছেন, অতিরিক্ত বিদ্যুৎ ব্যবহারের কারণে এ সমস্যা হচ্ছে। বিশেষ করে ক্যাম্পে ব্যাপক হারে বৈদ্যুতিক হিটার ব্যবহার করা হচ্ছে। এটি নিয়ন্ত্রণ করা গেলে লোড কমবে এবং বিদ্যুৎ বিভ্রাটও কমে আসবে।"
বিদ্যুৎ সংকটের নেপথ্য কারণ ব্যাখ্যা করে বিদ্যুৎ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান নেসকো পিএলসি-এর সৈয়দপুর কার্যালয়ের প্রকৌশলী আলিমুল ইসলাম সেলিম বলেন, "ওই ক্যাম্পগুলোতে অন্যান্য এলাকার মতোই ২০০ কেভিএ ক্ষমতাসম্পন্ন ট্রান্সফরমার স্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু বিনামূল্যে পেয়ে নির্ধারিত সীমার চেয়ে অনেক বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রায় প্রতিটি বাসায় বৈদ্যুতিক হিটারসহ উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করায় অতিরিক্ত লোড সৃষ্টি হচ্ছে। ফলে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। ব্যবহারকারীদেরও বিদ্যুৎ ব্যবহারে সচেতন হতে হবে। স্বাভাবিক ও সীমিত ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে লোডশেডিং বা বিদ্যুৎ বিভ্রাটের প্রশ্নই উঠবে না।"