
মশা মারার প্রযুক্তি দেখতে আমেরিকা সফরের সরকারি অনুমতি না মেলায় এবার চরম ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। এই সফরের ফাইলটি বাতিল হওয়ার পেছনে একটি বিশেষ স্বার্থান্বেষী মহলের গভীর ষড়যন্ত্র এবং মনগড়া তথ্য ছড়ানোর অভিযোগ তুলেছেন তিনি।
মঙ্গলবার (২ জুন) দুপুরে নিজের ভেরিফাইড ব্যক্তিগত ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে মেয়র দাবি করেন, মশক নিধনে জৈবিক প্রযুক্তির দেশীয় উৎপাদনের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখতে যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণের এই উদ্যোগ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ‘ভুল, মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর তথ্য’ দেওয়া হয়েছে।
ফেসবুক পোস্টে চসিক মেয়র লিখেছেন, "সব প্রস্তুতি যখন চূড়ান্ত, ঠিক তখনই একটি স্বার্থান্বেষী মহল মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে এই সফরের বিষয়ে সম্পূর্ণ ভুল, মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করে। ফলে দেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই সফরটি এখন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।"
মেয়র শাহাদাত হোসেন জানান, গত বছরের অক্টোবর মাস থেকে চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত চসিকের আওতাধীন এলাকায় আমেরিকার খ্যাতনামা প্রতিষ্ঠান 'ভ্যালেন্ট বায়োসায়েন্সেস এলএলসি'-এর মশার লার্ভা ধ্বংসকারী জৈবিক রাসায়নিক পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবহার করা হয়েছিল। এর কার্যকারিতা অত্যন্ত ইতিবাচক হওয়ায় বাংলাদেশে উক্ত মার্কিন প্রতিষ্ঠানের সাথে যৌথ উদ্যোগে একটি স্থায়ী ম্যানুফ্যাকচারিং প্ল্যান্ট বা উৎপাদন কারখানা গড়ে তোলার প্রস্তাব দেওয়া হয়।
তার দাবি, এই প্রস্তাবের ধারাবাহিকতায় কারিগরি ও বাণিজ্যিক সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠানটি মেয়রের নেতৃত্বে চসিকের একটি প্রতিনিধিদলকে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো ও ফ্লোরিডায় অবস্থিত তাদের উৎপাদন কারখানা ও গবেষণাগার পরিদর্শনের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। এমনকি এই সফরের যাবতীয় খরচও ওই মার্কিন কোম্পানিরই বহন করার কথা ছিল।
মেয়রের ভাষ্যমতে, এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশেই মশার লার্ভা মারার মানসম্মত রাসায়নিক উৎপাদন সম্ভব হতো, যা একদিকে যেমন বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করত, অন্যদিকে ডেঙ্গুসহ মারাত্মক মশাবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণে দেশে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করত।
উল্লেখ্য, চসিক মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন এবং বেশ কয়েকজন পদস্থ কর্মকর্তার এই যুক্তরাষ্ট্র সফরের একটি আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে পাঠানো হয়েছিল। তবে গত সোমবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সেই প্রস্তাবটি সরাসরি নাকচ করে দেন।
ফাইলের অনুমোদন না দিয়ে সরকারি নোটে প্রধানমন্ত্রী লিখেছেন, "মশক নিধন শেখা বা দেখার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় যাওয়ার দরকার নেই। দেশেই সন্ধ্যার পর যে কোনো ডোবার পাশে দুই-তিন ঘণ্টা অবস্থান করলেই মশক নিধনের অনেক উদ্ভাবনী পদ্ধতি বের করা সম্ভব হবে।"
সোমবার সন্ধ্যার পর থেকেই প্রধানমন্ত্রীর এই তীক্ষ্ণ ও ব্যতিক্রমী মন্তব্যটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। এর আগে সরকারি কর্মকর্তাদের ঠিকাদার বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের টাকায় বিদেশ সফরের প্রবণতা রোধে সরকারের পক্ষ থেকে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছিল। ফলে প্রধানমন্ত্রীর এমন কঠোর অবস্থান নেটিজেনদের মাঝে দারুণভাবে প্রশংসিত হচ্ছে।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের দাপ্তরিক তথ্য অনুযায়ী, মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো ও ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের একটি কারখানা ও গবেষণাগার পরিদর্শনের একটি সুনির্দিষ্ট রূপরেখা তৈরি করেছিল এই প্রতিনিধিদল।
প্রস্তাবিত এই প্রতিনিধিদলে মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন ছাড়াও চসিকের ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আশরাফুল আমিন, প্রধান পরিচ্ছন্নতা কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন ইখতিয়ার উদ্দীন আহমেদ, প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির চৌধুরী এবং ম্যালেরিয়া ও মশক নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা মো. সরফুল ইসলামের নাম অন্তর্ভুক্ত ছিল। পাশাপাশি, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকেও এই দলের সাথে যুক্ত করার জন্য আলাদা প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল।