
স্বর্ণালংকার ও নগদ টাকাসহ কোটি টাকার চুরির ঘটনায় উত্তাল রাজশাহীর সাহেববাজার স্বর্ণপট্টি। তবে চুরির পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে- চোর দোকানে ঢুকল কীভাবে? দুটি দোকানের মাঝের দেয়াল কাটা হলেও উভয় দোকানের শাটার ও তালা অক্ষত থাকায় ঘটনার রহস্য আরও ঘনীভূত হয়েছে।
নগরের সাহেববাজার স্বর্ণপট্টির কারুশ্রী জুয়েলার্সে এ চুরির ঘটনা ঘটেছে। পাশের দোকান আফিয়া জুয়েলার্স। কারুশ্রী জুয়েলার্সের মালিকের দাবি, পাশের দোকান থেকে দেয়াল কেটে চোরেরা তাদের দোকানে প্রবেশ করেছে। তবে আফিয়া জুয়েলার্সের মালিক বলছেন, উল্টো ঘটনাও ঘটতে পারে- চুরি হওয়া দোকান থেকেই তার দোকানের দিকের দেয়াল কাটা হয়ে থাকতে পারে।
ঘটনার তদন্তে থাকা নগরের বোয়ালিয়া থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মাসুদ কবির একটি বেসরকারি গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আমরা দুই দোকানের মালিকের সঙ্গেই কথা বলেছি। কেউই আমাদের সন্দেহের বাইরে নন। তদন্ত চলছে। আশা করছি দ্রুত রহস্য উদ্ঘাটন হবে।’
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত বৃহস্পতিবার রাত থেকে শনিবার ভোরের মধ্যে কোনো একসময় চুরির ঘটনাটি ঘটে। প্রায় দুই দশক ধরে ব্যবসা পরিচালনা করে আসছেন কারুশ্রী জুয়েলার্সের মালিক তূর্য সরকার ও তার ভাই ইমন সরকার। তাদের দাবি, দোকান থেকে প্রায় ২০০ ভরি স্বর্ণ, ১ হাজার ২০০ ভরি রুপার অলংকার এবং ২০ লাখ টাকা নগদ চুরি হয়েছে। চুরি হওয়া স্বর্ণালংকারের আনুমানিক মূল্য প্রায় সাড়ে ৫ কোটি টাকা।
কারুশ্রী জুয়েলার্স অবস্থিত একটি তিনতলা ভবনের নিচতলায়। ভবনের নিচতলায় রয়েছে একাধিক স্বর্ণের দোকান, আর দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলায় রয়েছে একটি আবাসিক হোটেল। কারুশ্রীর পাশেই আফিয়া জুয়েলার্স এবং তার পাশ দিয়ে হোটেলে ওঠার সিঁড়ির পথ। সেখানে একটি গেট থাকলেও হোটেল চালু থাকায় সেটি সাধারণত খোলা থাকে।
শনিবার সকালে দোকান খোলার সময় তূর্য সরকারের চাচাতো ভাই মো. শুভ প্রথমে অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করেন। শাটার খুলে তিনি দেখতে পান দোকানের ভেতরের জিনিসপত্র এলোমেলো অবস্থায় পড়ে আছে। পরে দেখা যায়, সিন্দুক ভেঙে স্বর্ণালংকার নিয়ে যাওয়া হয়েছে এবং দুই দোকানের মাঝের ইটের দেয়ালের একটি অংশ কাটা।
খবর পেয়ে তূর্য সরকার ঘটনাস্থলে এসে পাশের দোকানের মালিক খন্দকার আরিফুর রহমানকে ডাকেন। তিনি এসে দেখেন, তার দোকানের শাটারের তালা অক্ষত রয়েছে। চাবি দিয়ে তালা খুলে ভেতরে প্রবেশের পর দেখা যায়, দেয়ালে কাটার চিহ্ন থাকলেও তার সিন্দুক ও ভেতরের মালামাল অক্ষত রয়েছে। তিনি জানান, তার সিন্দুকে প্রায় দেড় লাখ টাকার অলংকার ছিল, কিন্তু সেগুলো চুরি হয়নি।
আফিয়া জুয়েলার্সের মালিক খন্দকার আরিফুর রহমান বলেন, ‘আমার দোকান দিয়ে চোর ঢুকলে শাটারের তালা ভাঙা থাকত। চুরির ঘটনা জানাজানির পর আমি এলাম। চাবি দিলাম, তালা খুলে ঢুকল। আমার দোকানের শাটারের তালা যেমন অক্ষত, তেমনি কারুশ্রীর শাটার ও তালা অক্ষত। এমনও তো হতে পারে কারুশ্রীতে চুরির পর চোর দেয়াল কেটে আমার দোকানে ঢুকেছিল। সিন্দুক ভাঙার সময় হয়তো পায়নি। আমি আল্লাহকে বলেছি, ইনশাআল্লাহ রহস্য উন্মোচন হয়ে যাবে। আপনারা সবই দেখতে পাবেন।’
ঘটনার প্রতিবাদে শনিবার স্বর্ণপট্টির সব জুয়েলারি দোকান বন্ধ রাখেন ব্যবসায়ীরা। তারা বিক্ষোভ মিছিলও করেন। দুপুরে কারুশ্রী জুয়েলার্সের সামনে জড়ো হন ব্যবসায়ীরা। সেখানে উপস্থিত থাকলেও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত তূর্য সরকার গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে পারেননি।
তূর্যের ভাই ইমন সরকার বলেন, ‘আমাদের সব মালামাল দোকানেই থাকত। কোনো কিছুই আমরা বাড়িতে নিয়ে যেতাম না। চোর চুরি করে সিসিটিভি ক্যামেরার ডিভিআরও নিয়ে গেছে।’ যদিও সরাসরি কারও নাম উল্লেখ করেননি, তার বক্তব্যে পাশের দোকানের মালিক বা কর্মচারীদের প্রতি সন্দেহের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তিনি আরও বলেন, ‘২৪ ঘণ্টা পার হয়ে গেল। আমরা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো আশ্বাস পেলাম না। কাউকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্যও পুলিশ ধরল না।’
এ ঘটনায় শুক্রবার রাতে তূর্য সরকার বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বোয়ালিয়া থানায় মামলা দায়ের করেন।
তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে মহানগর পুলিশের মুখপাত্র ও অতিরিক্ত উপকমিশনার গাজিউর রহমান রোববার বিকেলে একটি বেসরকারি গণমাধ্যমকে জানান, পুলিশের পাশাপাশি আরও কয়েকটি সরকারি সংস্থা তদন্তে যুক্ত রয়েছে। তারা কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করেছে, যা বর্তমানে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। তথ্য যাচাই শেষে বিস্তারিত জানানো হবে।
এদিকে, বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) রাজশাহী জেলা শাখার সভাপতি আশরাফুল ইসলাম বলেন, চুরি যাওয়া অলংকার উদ্ধারে এবং জড়িতদের গ্রেপ্তারে প্রশাসনকে তারা ২৪ ঘণ্টার সময়সীমা বেঁধে দিয়েছিলেন, যা ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। তবে পুলিশ কমিশনার দ্রুত অগ্রগতির আশ্বাস দিয়েছেন। তিনি জানান, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে এবং র্যাবসহ অন্যান্য সংস্থাকেও তদন্তে যুক্ত করা হয়েছে। পরিস্থিতি পর্যালোচনায় ব্যবসায়ীরা রাতে বৈঠকে বসবেন।