
সুন্দরবনে সক্রিয় দস্যু ও ডাকাত দল দমনে বড় ধরনের সাফল্য পেয়েছে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড। সুন্দরবনের গহীনে কুখ্যাত ‘দুলাভাই বাহিনী’র আস্তানায় টানা দুই দিনব্যাপী এক বিশেষ অভিযানে কোস্ট গার্ডের সাথে ডাকাত দলের তীব্র বন্দুকযুদ্ধের ঘটনা ঘটেছে। এতে বাহিনী প্রধানসহ দুই ডাকাতকে আটক করা হয়েছে এবং গুলিবিদ্ধ হয়ে শওকত সরদার নামে এক ডাকাত নিহত হয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা হয়েছে বিপুল পরিমাণ দেশি-বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদ। শনিবার দুপুরে কোস্ট গার্ড মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
কোস্ট গার্ড সূত্রে জানা যায়, বর্তমান সরকারের নির্দেশনায় সুন্দরবনে সক্রিয় বনদস্যু বাহিনী নির্মূল এবং উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিশ্চিতের লক্ষ্যে “অপারেশন ম্যানগ্রোভ শিল্ড” পরিচালনা করা হচ্ছে। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে কোস্ট গার্ড জানতে পারে যে, খুলনা জেলার কয়রা থানার বনপাড়া সংলগ্ন সুন্দরবনের গহীনে ‘দুলাভাই বাহিনী’র সদস্যরা অবস্থান করছে। এই তথ্যের ভিত্তিতে গত ২৫ জুন বিকাল ৫টা থেকে কোস্ট গার্ড বেইস মোংলা, স্টেশন কয়রা এবং স্টেশন নলিয়ান যৌথভাবে ওই এলাকায় একটি বিশেষ অভিযান শুরু করে।
টানা দুই দিনব্যাপী পরিচালিত এই অভিযানের একপর্যায়ে দস্যুদের বহনকারী দুটি বোট শনাক্ত করেন কোস্ট গার্ড সদস্যরা। সে সময় বোট দুটিকে থামার সংকেত দেওয়া হলে, ডাকাতদল তা অমান্য করে কোস্ট গার্ডকে লক্ষ্য করে অতর্কিত গুলি ছুড়তে শুরু করে। আত্মরক্ষার্থে কোস্ট গার্ড সদস্যরাও পাল্টা গুলি চালালে উভয় পক্ষের মধ্যে তীব্র বন্দুকযুদ্ধ শুরু হয়। গোলাগুলির একপর্যায়ে ডাকাতদের একটি বোটে আগুন ধরে যায় এবং অপর বোটটি পানিতে ডুবে যায়। পুরো অভিযানে কোস্ট গার্ডের পক্ষ থেকে ১ রাউন্ড ব্ল্যাঙ্ক কার্টিজ এবং ২১৬ রাউন্ড তাজা গোলা ফায়ার করা হয়।
বন্দুকযুদ্ধ শেষে কোস্ট গার্ড সদস্যরা ঘটনাস্থলে তল্লাশি চালিয়ে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় ‘দুলাভাই বাহিনী’র প্রধান রবিউল ইসলাম (৫০) ও ডাকাত শওকত সরদারকে (৫৫) আটক করে। তাদের দ্রুত কয়রা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক শওকত সরদারকে মৃত ঘোষণা করেন। অন্যদিকে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে গুরুতর আহত বাহিনী প্রধান রবিউল ইসলামকে উন্নত চিকিৎসার জন্য খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়। আটক রবিউল ও নিহত শওকত উভয়ই খুলনা জেলার কয়রা থানার বাসিন্দা।
এদিকে অভিযানের সময় কৌশলে পালিয়ে যাওয়া অন্য ডাকাতদের ধরতে কোস্ট গার্ড ও বাংলাদেশ পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে যৌথ চিরুনি অভিযান শুরু করে। মঠবাড়িয়া পুলিশ ফাঁড়ির সামনের এলাকায় স্থানীয় জনগণের সহায়তায় পরিচালিত এই যৌথ অভিযানে ইসরাফিল হাওলাদার (২৬) নামে আরও এক ডাকাতকে হাতের আঙুলে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় আটক করা হয়। সাতক্ষীরা জেলার আশাশুনি থানার বাসিন্দা এই ডাকাতকে পরবর্তীতে চিকিৎসার জন্য কয়রা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে।
বন্দুকযুদ্ধের পর আরশিবসা নদীর বেসুখাল এলাকায় ব্যাপক তল্লাশি চালিয়ে ডাকাত দলের ব্যবহৃত ৬টি একনলা বন্দুক, ৬৯ রাউন্ড তাজা কার্তুজ, ৩ রাউন্ড ফাঁকা কার্তুজ, ১টি দেশীয় অস্ত্র, ১টি মোবাইল ও ১টি হাতঘড়ি উদ্ধার করা হয়। কোস্ট গার্ডের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আটককৃত ডাকাত ও উদ্ধারকৃত অস্ত্র-গোলাবারুদের বিষয়ে পরবর্তী আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং নিহত ডাকাতের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য কয়রা থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে। সুন্দরবনকে সম্পূর্ণরূপে দস্যুমুক্ত করতে ডাকাত ও তাদের সহায়তাকারীদের বিরুদ্ধে কোস্ট গার্ডের এই কঠোর অভিযান ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে বলে বাহিনীর পক্ষ থেকে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়েছে।