
তিস্তা নদীর পানি বাড়ার সঙ্গে কুড়িগ্রামে তীব্র আকার ধারণ করেছে নদীভাঙন। রাজারহাট উপজেলার বুড়িরহাট এলাকায় তিস্তার ক্রসবাঁধের প্রায় ৪০ মিটার অংশ ইতোমধ্যে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। মঙ্গলবার ভোর থেকে বাঁধটিতে ভাঙন শুরু হওয়ায় আতঙ্কে রয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। পরিস্থিতি সামাল দিতে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) জিও ব্যাগ ফেললেও দ্রুত টেকসই ব্যবস্থা না নিলে বাঁধটি রক্ষা করা কঠিন হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।
বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) সরেজমিনে দেখা যায়, বুড়িরহাট ক্রসবাঁধটি ভেঙে গেলে রাজারহাট উপজেলার বড়দরগা, বুড়িরহাট, রামহরি, চতুরা, কালিরমেলা ও ডাংরারহাট গ্রামের মানুষ সরাসরি ভাঙনের ঝুঁকিতে পড়বেন। একই সঙ্গে শত শত বসতভিটা, ঘরবাড়ি ও ফসলি জমির পাশাপাশি অন্তত পাঁচটি স্থানীয় বাজার হুমকির মুখে পড়বে।
স্থানীয়রা জানান, মঙ্গলবার সকাল ৭টার দিকে বুড়িরহাট ক্রসবাঁধের মূল সড়কের একটি অংশে আকস্মিক ফাটল দেখা দেয়। এরপর দ্রুত উত্তর ও দক্ষিণ দিকে ভাঙন ছড়িয়ে পড়ে। নদীতে স্রোতের তীব্রতা বেশি থাকায় বাঁধের নিচের মাটি ও বালু দ্রুত সরে যাচ্ছে। এতে বাঁধের পরিস্থিতি আরও নাজুক হয়ে উঠেছে।
শুধু তিস্তাপাড় নয়, জেলার উলিপুর উপজেলার দুর্গম চরাঞ্চলেও নদীভাঙনের ভয়াবহতা দেখা দিয়েছে। সাহেবের আলগা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি এখন ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনের মুখে। যেকোনো সময় বিদ্যালয়টি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এরই মধ্যে বিদ্যালয়ের আশপাশের অর্ধশতাধিক বসতবাড়ি নদীতে বিলীন হয়েছে। একই সঙ্গে ওই ইউনিয়নের একমাত্র কমিউনিটি ক্লিনিকটিও ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, গত এক মাসে ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙনে জাহাজের আলগা এলাকায় অর্ধশতাধিক বসতবাড়ি এবং প্রায় ৪০ একর ফসলি জমি নদীগর্ভে চলে গেছে। ভাঙন অব্যাহত থাকায় পুরো গ্রামের দুই শতাধিক বসতবাড়ি এখন হুমকির মুখে।
এলাকার ল্যাম্ব হাসপাতাল, একটি কমিউনিটি ক্লিনিক, নূরানী মাদরাসা, জামে মসজিদ, নতুন বাজার এবং দই খাওয়ার চর নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়সহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাও ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
সাহেবের আলগা ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক ইউপি সদস্য আব্দুল বাতেন বলেন, ‘আমরা বড় কিছু চাই না, শুধু আমাদের সন্তানদের পড়াশোনার এই শেষ আশ্রয়টুকু বাঁচাতে চাই। স্কুলটি নদীতে চলে গেলে এই চরাঞ্চলের শিশুদের ভবিষ্যৎ কোথায় যাবে?’
স্থানীয় বাসিন্দা ও বিদ্যালয়টির সাবেক শিক্ষার্থী অ্যাডভোকেট নুরুজ্জামান বলেন, ‘একটি বিদ্যালয় হারিয়ে যাওয়া মানে শুধু একটি ভবন বিলীন হওয়া নয়। এর সঙ্গে পুরো একটি এলাকার প্রজন্মের স্বপ্ন ও ভবিষ্যৎও অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে। ভাঙন মোকাবিলায় পানি উন্নয়ন বোর্ড ও সরকারের সহযোগিতা চাই।’
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ফিরোজা বেগম বলেন, ‘ব্রহ্মপুত্রের তীব্র স্রোতে বিদ্যালয়টি এখন চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। যেকোনো মুহূর্তে এটি নদীগর্ভে বিলীন হতে পারে। বর্তমান বিদ্যালয়টি জরুরি ভিত্তিতে নিরাপদ স্থানে স্থানান্তর করা প্রয়োজন।’
তিনি আরও বলেন, ‘বিদ্যালয়টি রক্ষায় কিংবা প্রয়োজনে দ্রুত নিরাপদ স্থানে স্থানান্তরের জন্য জেলা ও উপজেলা প্রশাসন, পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং শিক্ষা বিভাগের দ্রুত হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।’
এ বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কুড়িগ্রামের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাকিবুল হাসান বলেন, ‘ক্রসবাঁধ ভাঙনের খবর পেয়ে পরিদর্শন করা হয়েছে। তাৎক্ষণিকভাবে জিও ব্যাগ ফেলা শুরু করা হয়েছে।’
ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ব্রহ্মপুত্রের চরাঞ্চলে ভাঙনের বিষয়টি আমরা অবগত হয়েছি। দ্বীপচরের মধ্যে হওয়ায় সেখানে কাজ করার সুযোগ সীমিত। তবুও আমরা চেষ্টা করছি। বর্তমানে জেলার ৭২টি পয়েন্টে ভাঙন চলমান রয়েছে। এর মধ্যে ৫২টি পয়েন্টে ভাঙন মোকাবিলায় কাজ চলছে।’