
চট্টগ্রাম নগরে আন্তর্জাতিক অনলাইন প্রতারণা চক্রের ৬৩ সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে চীন, লাওস, পাকিস্তান, নেপাল ও ভিয়েতনামের নাগরিক রয়েছেন। অভিযানে অনলাইন প্রতারণায় ব্যবহৃত বিভিন্ন ধরনের ডিভাইস, সরঞ্জাম ও নথিপত্র জব্দ করা হয়েছে।
তবে গ্রেপ্তার হওয়া ৬৩ জনের কারও পাসপোর্ট উদ্ধার করতে পারেনি পুলিশ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভাষ্য, একজন বাংলাদেশির কাছে তাদের পাসপোর্ট রয়েছে। এ কারণে তারা বৈধভাবে বাংলাদেশে অবস্থান করছিলেন কি না, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এমনকি কোন ধরনের ভিসায় তারা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছিলেন, সে তথ্যও জানতে পারেনি পুলিশ। ওই বাংলাদেশিকে শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের চট্টগ্রাম মহানগর হাকিম আবুল মনসুরের আদালতে হাজির করা হয়। শুনানি শেষে আদালত তাদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। পরে সন্ধ্যায় তাদের চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে নেওয়া হয়।
গ্রেপ্তার ৬৩ জনের মধ্যে ৫ জন চীনের, ৩৪ জন লাওসের, ২১ জন পাকিস্তানের, ২ জন নেপালের এবং ১ জন ভিয়েতনামের নাগরিক। তাদের মধ্যে নারী রয়েছেন ২০ জন।
১৪টি ফ্ল্যাট নিয়ে চলছিল কার্যক্রম
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা প্রায় দেড় মাস আগে চট্টগ্রাম নগরের খুলশী থানার কৃষ্ণচূড়া আবাসিক এলাকার ৪ নম্বর সড়কে অবস্থিত একটি আটতলা ভবনের ১৪টি ফ্ল্যাট ভাড়া নেন। ভবনটির মালিক একজন দুবাইপ্রবাসী।
পুলিশের অভিযোগ, ওই ভবনে বসেই বিভিন্ন ওয়েবসাইট, মুঠোফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে অনলাইন প্রতারণার কার্যক্রম পরিচালনা করতেন তারা।
তদন্তসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, চক্রটি কখনো নিজেরাই ওয়েবসাইট তৈরি করত। আবার কখনো চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে মানুষের কাছ থেকে অর্থ আদায় করত। পাশাপাশি ব্যাংকসহ বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের লেনদেনসংক্রান্ত তথ্য হ্যাক করে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার সঙ্গেও তাদের সম্পৃক্ততা থাকতে পারে বলে সন্দেহ করছে পুলিশ।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের কাছ থেকে উদ্ধার করা ডিভাইসগুলো পরীক্ষা করে দেখছেন ঢাকার একটি বিশেষজ্ঞ দল।
বাংলাদেশে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে চক্রটির সদস্যদের স্থানীয় কিছু ব্যক্তি লজিস্টিক সহায়তা দিয়ে আসছিলেন বলেও জানিয়েছে পুলিশ।
তদন্তে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, এসব সহযোগীর কয়েকজন চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় অবস্থান করছেন। তাদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের জন্য অভিযান চালানো হচ্ছে।
অভিযানে উদ্ধার ১৭০ ধরনের ডিভাইস ও সরঞ্জাম
আটতলা ভবনটিতে অভিযান চালানোর সময় প্রায় ১৭০ ধরনের ডিভাইস ও সরঞ্জাম জব্দ করা হয়। উদ্ধার করা সামগ্রীর মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ১৩৪টি পুরোনো ও ব্যবহৃত মুঠোফোন, একটি পুরোনো অ্যাপল ট্যাব, ৫৭টি ল্যাপটপ, একটি সিপিইউ, একটি মনিটর এবং পাঁচটি পেনড্রাইভ।
এ ছাড়া তিনটি পাকিস্তানি জাতীয় পরিচয়পত্রসহ বিভিন্ন ধরনের নথিপত্রও জব্দ করেছে পুলিশ।
এ ঘটনায় গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে খুলশী থানায় সাইবার সুরক্ষা আইনে মামলা করা হয়েছে।
কেন বাংলাদেশকে বেছে নিয়েছে চক্রটি
চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার ফয়সাল আহম্মদ বলেন, লাওস, ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ায় অনলাইন প্রতারকদের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান চলার কারণে প্রতারণার কার্যক্রম চালাতে তারা বাংলাদেশকে বেছে নিয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।
তিনি জানান, চক্রটি যে ভবনটি ভাড়া নিয়েছিল, সেখানে ১৪টি ইউনিটে সার্ভার, কম্পিউটার, ল্যাপটপসহ অনলাইন প্রতারণায় ব্যবহৃত বিভিন্ন সরঞ্জাম পাওয়া গেছে।
ফয়সাল আহম্মদ বলেন, গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা বাংলাদেশে অবস্থানের বৈধ কাগজপত্র দেখাতে পারেননি। তারা কীভাবে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছেন, সে বিষয়ে পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।
এ ছাড়া কক্সবাজারে অবস্থান করা কোনো প্রতারক চক্রের সঙ্গে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের যোগাযোগ বা যোগসূত্র রয়েছে কি না, সেটিও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
পাসপোর্ট নেই কারও, খোঁজা হচ্ছে বাংলাদেশি সহযোগী
খুলশী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুর রহিম বলেন, অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড সহজে পরিচালনার উদ্দেশ্যেই চক্রটি ওই ভবন ভাড়া নিয়েছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। কারণ, ভাড়াটিয়াদের কর্মকাণ্ডে তুলনামূলকভাবে নজরদারি কম থাকে।
ওসি বলেন, ‘৬৩ জনের কারও পাসপোর্ট আমরা পাইনি। একজন বাংলাদেশি তাদের পাসপোর্ট নিয়ে নিয়েছেন। ওই ব্যক্তিকে আমরা খুঁজছি। তাকে পাওয়া গেলে চক্রটির বিষয়ে আরও তথ্য পাওয়া যাবে।’
পুলিশ জানিয়েছে, এই অভিযানে শুধু পুলিশ নয়, একাধিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী ও সংশ্লিষ্ট সংস্থা একসঙ্গে কাজ করেছে।