
চট্টগ্রামের পটিয়ায় ১৩টি মামলার আসামি এবং গ্রেপ্তারি পরোয়ানাভুক্ত সাইফুদ্দিন ওরফে সাইফুল ইসলাম ওরফে ‘বালু সাইফুকে’ গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তার বিরুদ্ধে ৪ আগস্ট পটিয়ায় ছাত্র-জনতার ওপর সরাসরি গুলিবর্ষণসহ অপহরণ, চাঁদাবাজি, মারামারি, মাদক ও বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে মামলা রয়েছে।
বুধবার ভোর ৩টা ৪৫ মিনিটে উপজেলার হাইদগাঁও ইউনিয়নের পূর্ব হাইদগাঁও এলাকায় নিজের বাড়িতে এলে সেখান থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
সাইফুদ্দিন পটিয়া উপজেলা আওয়ামী যুবলীগের সাবেক সহ-সম্পাদক এবং হাইদগাঁও ইউনিয়ন যুবলীগের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক।
আ. লীগ আমলে অপরাধ জগতের নিয়ন্ত্রণ
সাইফুদ্দিন ওরফে ‘বালু সাইফু’কে নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে দীর্ঘদিন ধরে নানা অভিযোগ রয়েছে।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় এমপি সামশুল হক চৌধুরীর মেয়াদে তিনি অপরাধ জগত নিয়ন্ত্রণের সুযোগ পাননি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ২০২৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের দক্ষিণ জেলা সভাপতি মোতাহেরুল ইসলাম চৌধুরী জয়ী হওয়ার পর কয়েকজন মিলে পটিয়ার অপরাধ জগতের নিয়ন্ত্রণ নেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, সাইফুদ্দিনের বিরুদ্ধে অপহরণ, চাঁদাবাজি, মারামারি, মাদক ও বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে মোট ১৩টি মামলা রয়েছে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ২০ ও ২৭ আগস্ট দায়ের করা পৃথক দুটি মামলায় বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের বিভিন্ন ধারায় সাইফুদ্দিনকে আসামি করা হয়।
একই বছরের ১ নভেম্বর দায়ের করা আরেকটি মামলায় তার বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টা, মারধর, চুরি, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের বিভিন্ন ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।
এ ছাড়া পটিয়ায় ৪ আগস্ট ছাত্র-জনতার ওপর সরাসরি গুলিবর্ষণের ঘটনাতেও তার বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে।
সরকার পতনের পরও পাহাড়ে অবস্থান
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরও সাইফুদ্দিন পাহাড়ে অবস্থান করে প্রকাশ্যে নানা অপকর্ম চালিয়ে আসছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ সময় নিয়মিত ফেসবুকে সরকারবিরোধী অপপ্রচার ও উসকানিমূলক বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
তার কর্মকাণ্ড নিয়ে পটিয়ার রাজনীতিবিদ ও প্রশাসনের মধ্যে অস্বস্তি ছিল বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
তাকে গ্রেপ্তারের জন্য পটিয়া থানার পাশাপাশি বিভিন্ন থানার পুলিশ একাধিকবার অভিযান চালালেও এতদিন তাকে আটক করা সম্ভব হয়নি।
চোলাই মদের কারখানা ও চাঁদাবাজি
স্থানীয়দের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরও পটিয়ায় চোলাই মদের ব্যবসাসহ নানা অপরাধে জড়িত ছিলেন সাইফুদ্দিন। পাহাড়ের জমি ও বাগানের মালিকদের জিম্মি করে মাসিক ভিত্তিতে চাঁদা আদায়ের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, পটিয়া ও রাঙ্গুনিয়া সীমান্তের পাহাড়ের তিকুরাপাড়া এলাকায় তার একটি বড় চোলাই মদের কারখানা রয়েছে। সেখান থেকে বিকেলের দিকে মদের চালান পটিয়ার পাহাড়ের পাদদেশে নিয়ে আসা হতো। এরপর সন্ধ্যার পর বিভিন্ন যানবাহনে করে পটিয়া, বোয়ালখালী, আনোয়ারা এবং চন্দনাইশের একাংশে এসব চালান পাঠানো হতো বলে অভিযোগ রয়েছে।
সশস্ত্র দলের মাধ্যমে পাহাড়ে নিয়ন্ত্রণ
স্থানীয়দের দাবি, সাইফুদ্দিনের নেতৃত্বে পাহাড়ে ১০ থেকে ১২ জনের একটি সশস্ত্র সন্ত্রাসী দল রয়েছে।
বাগান মালিক ও তাদের শ্রমিকদের সেখানে যাতায়াতের ক্ষেত্রেও ওই দলের নিয়ন্ত্রণ ছিল বলে অভিযোগ করা হয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, মাসিক হারে চাঁদা দেওয়ার পর টোকেন না নিলে কোনো বাগান মালিক বা শ্রমিক পাহাড়ের ওই এলাকায় যেতে পারতেন না।
চাঁদা না দিয়ে কেউ পাহাড়ে গেলে তাকে অপহরণ করে মোটা অঙ্কের অর্থ আদায় করা হতো বলেও অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।
পটিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জিয়াউল হক জানান, সাইফুদ্দিনের বিরুদ্ধে পটিয়া থানায় মোট ১৩টি মামলা রয়েছে।
গ্রেপ্তারের পর তাকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে বলে জানান তিনি।