
জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্ক সফরের প্রথম দিনেই তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। স্থানীয় সময় মঙ্গলবারের এই বৈঠকে দুই দেশের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরও জোরদার করার পাশাপাশি পারস্পরিক স্বার্থ ও অভিন্ন অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র তৈরির বিষয়ে নিজেদের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন দুই নেতা।
নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরের কাছাকাছি ৮২১ ইউনাইটেড নেশন্স প্লাজায় অবস্থিত তুর্কি হাউজে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। পরে সাংবাদিকদের এ বিষয়ে অবহিত করেন প্রধানমন্ত্রীর সহকারী প্রেস সচিব একেএম নাজমুল হক।
অর্থনীতি, বাণিজ্য ও বিনিয়োগে সহযোগিতা
প্রধানমন্ত্রীর সহকারী প্রেস সচিব জানান, বৈঠকে বাংলাদেশ ও তুরস্কের ঐতিহাসিক ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী এবং বহুমাত্রিক করার উদ্দেশ্যে পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মতবিনিময় করেন তারেক রহমান ও এরদোগান।
আলোচনায় অর্থনীতি, বাণিজ্য ও বিনিয়োগসহ বিভিন্ন খাতে দুই দেশের মধ্যে বর্তমানে যে সহযোগিতা রয়েছে, তা আরও বিস্তৃত করার সম্ভাবনাও উঠে আসে।
পাশাপাশি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পরিসরের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে আলোচনা করেন দুই নেতা। পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট এসব বিষয়ে বাংলাদেশ ও তুরস্কের মধ্যে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ, সহযোগিতা ও সমন্বয় ভবিষ্যতেও অব্যাহত রাখার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেওয়া হয়।
রোহিঙ্গাদের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি এরদোগানের
তারেক রহমান ও এরদোগানের বৈঠকে বিশেষ গুরুত্ব পায় রোহিঙ্গা সংকটও।
বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার জন্য বাংলাদেশের ভূমিকার প্রশংসা করেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট। একই সঙ্গে রোহিঙ্গাদের জন্য মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখার আশ্বাস দেন তিনি।
আশ্রয়, শিক্ষা ও অবকাঠামোসহ রোহিঙ্গাদের প্রয়োজনীয় বিভিন্ন ক্ষেত্রে তুরস্কের সহযোগিতা চালিয়ে যাওয়ার কথাও জানান এরদোগান।
বিশ্বনেতাদের সম্মানে ট্রাম্পের নৈশভোজে তারেক
নিউইয়র্ক সফরের প্রথম দিনের কর্মসূচির মধ্যে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আয়োজন ছিল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দেওয়া বিশ্বনেতাদের সম্মানে নৈশভোজ।
জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে অংশ নিতে আসা বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান এবং তাদের স্ত্রীদের সম্মানে এই নৈশভোজের আয়োজন করা হয়। এতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে তার স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমানও অংশ নেন।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ৮১তম সাধারণ পরিষদের সাধারণ বিতর্ক ২২ থেকে ২৬ সেপ্টেম্বর এবং ২৮ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
মানবিক সহায়তা সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে প্রাতরাশ বৈঠক
নিউইয়র্ক সফরের পরের দিন বুধবার স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে ৮টায় জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনে আন্তর্জাতিক দাতব্য, জনহিতকর ও মানবিক সহায়তা সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে প্রাতরাশ বৈঠকে বসেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
বিশ্বের বিভিন্ন শীর্ষস্থানীয় জনহিতকর ও মানবিক সহায়তা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা এ বৈঠকে অংশ নেন। অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ছিল গেটস ফাউন্ডেশন, ভিসা ফাউন্ডেশন, রকেফেলার ফাউন্ডেশন, ইন্টারন্যাশনাল রেসকিউ কমিটি (আইআরসি) এবং রোটারি ইন্টারন্যাশনালসহ আরও কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংস্থা।
বৈঠকে বাংলাদেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন, মানবিক সহায়তা এবং প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন উদ্যোগে আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব আরও শক্তিশালী করার বিষয়টি গুরুত্ব পায়।
একই সঙ্গে বিশ্বজুড়ে দাতব্য ও মানবিক সহযোগিতার পরিসর বাড়ানো এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য কার্যকর অংশীদারত্ব গড়ে তোলার বিষয়েও আলোচনা হয়।
উন্নয়ন ও মানবিক সংকটে আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব
বাংলাদেশের জন্য আন্তর্জাতিক জনহিতকর ও মানবিক সহায়তা সংস্থাগুলোর সহযোগিতা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে।
দারিদ্র্য কমানো, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, সামাজিক সুরক্ষা, প্রযুক্তি, জলবায়ু সহনশীলতা এবং মানবিক সংকট মোকাবিলার মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে নতুন উদ্যোগ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
বৈঠকে বাংলাদেশের উন্নয়ন ও মানবিক কার্যক্রমে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সম্পৃক্ততা আরও জোরদার করার বিষয়টিই গুরুত্ব পায়।
ভুটান, মালদ্বীপ, বিশ্বব্যাংক ও হাইতির প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনকে ঘিরে নিউইয়র্কে অবস্থানকালে একাধিক দেশের শীর্ষ নেতা ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
অধিবেশনের ফাঁকে তিনি ভুটানের প্রধানমন্ত্রী শেরিং তোবগে, মালদ্বীপের ভাইস প্রেসিডেন্ট উজ হুসেইন মোহাম্মদ লতিফ, বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা এবং হাইতির প্রধানমন্ত্রী আলিক্স দিদিয়ে ফিলস-এমের সঙ্গে বৈঠক করেন।
এ ছাড়া জাতিসংঘের মিয়ানমারবিষয়ক বিশেষ দূত জুলি বিশপ, ইউএনএইচসিআর প্রধান বারহাম সালেহ এবং জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার তুর্কের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেন তিনি।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনকে কেন্দ্র করে বিশ্বনেতাদের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসায়ী মহলের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগও বাংলাদেশ কাজে লাগাচ্ছে।
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন
ইউএনএইচসিআর প্রধান বারহাম সালেহর সঙ্গে বৈঠকে রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানের বিষয়টি তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
তিনি বলেন, ‘মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের নিজ ভূমিতে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের কোনো বিকল্প নেই।’
রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের ভূমিকার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
তারেক রহমান বলেন, ‘মানবিক বিবেচনায় বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে আসছে। সংকটের স্থায়ী সমাধানে রোহিঙ্গাদের নিজ ভূমিতে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের কোনো বিকল্প নেই। এ লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও কার্যকর ও সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।’