
কখনও ‘জিনের বাদশা’, কখনও তান্ত্রিক-কবিরাজ, আবার কখনও পরিচিত ব্যবসায়ীর পরিচয় ব্যবহার করে প্রতারণা—এমন নানা কৌশলে মানুষের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে একটি চক্রের দুই সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। আট মাসের তদন্ত ও প্রচেষ্টার পর গত সোমবার ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলার কুঞ্জেরহাট বাজারের আশপাশ থেকে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়।
গ্রেপ্তার দুজন হলেন বোরহানউদ্দিন উপজেলার ফুলকাচিয়া গ্রামের সুমন হাওলাদার (২৬) ও মূলপাইততন গ্রামের মো. রাজিব মিয়া (২৮)।
বুধবার দুপুর ১২টার দিকে ফরিদপুর পিবিআই কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান সংস্থাটির পুলিশ সুপার মো. রবিউল ইসলাম। তিনি বলেন, ২০২৪ সালের ২১ অক্টোবর রাজবাড়ী সদর থানায় দায়ের করা একটি প্রতারণার মামলার তদন্ত করতে গিয়ে চক্রটির সন্ধান পাওয়া যায়। মামলাটি করেছিলেন রাজবাড়ী সদর থানার বিনোদপুর এলাকার চাল ব্যবসায়ী রশিদুল ইসলাম।
পিবিআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ২৫ মার্চ প্রতারকদের ফাঁদে পড়েন রশিদুল। তাঁর পরিচিত ব্যবসায়ী বিজয় বাবুর মুঠোফোন নম্বর ক্লোন করে চক্রের সদস্যরা তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। জরুরি টাকার প্রয়োজনের কথা জানিয়ে সুলভ মূল্যে ৩৩ টন চাল বিক্রির প্রস্তাব দেওয়া হয়। একই সঙ্গে বিকেল ৪টার মধ্যে চাল পৌঁছে দেওয়ার আশ্বাসও দেওয়া হয়।
বিজয় বাবুর সঙ্গে আগে ব্যবসায়িক লেনদেন থাকায় প্রস্তাবটি বিশ্বাস করেন রশিদুল। পরে চক্রের দেওয়া বিকাশ ও নগদ নম্বরে দুপুর থেকে বিকেলের মধ্যে আটটি নম্বর ব্যবহার করে মোট ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা পাঠান তিনি। তবে নির্ধারিত সময় পার হলেও চালের গাড়ি না পৌঁছানোয় বিজয় বাবুর অফিসে যোগাযোগ করেন রশিদুল। তখন জানতে পারেন, চাল বিক্রির বিষয়ে বিজয় বাবুর সঙ্গে তাঁর কোনো কথাই হয়নি। প্রতারণার শিকার হয়েছেন বুঝতে পেরে তিনি রাজবাড়ী সদর থানায় অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে মামলা করেন।
মামলাটি আট মাস তদন্তের পর কোনো আসামিকে গ্রেপ্তার না করেই আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন সংশ্লিষ্ট তদন্ত কর্মকর্তা। পরে আদালতের নির্দেশে চলতি বছরের ২২ ফেব্রুয়ারি মামলাটির তদন্তভার পায় ফরিদপুর পিবিআই। তদন্তের দায়িত্বে ছিলেন সংস্থাটির উপপরিদর্শক (এসআই) মাজিদুল হক খান।
পুলিশ সুপার রবিউল ইসলাম জানান, চক্রটির নেটওয়ার্ক দেশজুড়ে বিস্তৃত। এতে পাঁচজন সদস্য রয়েছেন বলে প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে। তাঁদের মধ্যে শারীরিক প্রতিবন্ধী সুমন বিভিন্ন বিকাশ ক্যাশআউট পয়েন্ট থেকে প্রতারণার অর্থ সংগ্রহ করতেন। অন্য সদস্যরা ভুক্তভোগীদের ব্যক্তিগত তথ্য, মুঠোফোন নম্বর এবং বিকাশ নম্বর সংগ্রহ করতেন।
গোয়েন্দা তথ্য, তথ্যপ্রযুক্তি ও নির্ভরযোগ্য সূত্রের সহায়তায় সুমনকে শনাক্ত করার পর তাঁর চলাফেরার ওপর নজরদারি চালানো হয়। একপর্যায়ে গত সোমবার তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে গ্রেপ্তার করা হয় চক্রের আরেক সদস্য রাজিব মিয়াকে।
গ্রেপ্তারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে দুজনই বিভিন্ন ধরনের প্রতারণার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন বলে জানান পুলিশ সুপার। তিনি বলেন, ‘কখনও জিনের বাদশাহ পরিচয়ে গভীর রাতে, বিশেষ করে নারীদের ফোন করতেন চক্রের সদস্যরা। মুঠোফোনের পাশে অদ্ভুত শব্দ করে ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি করতেন তারা। এরপর ভুক্তভোগীর মনে মূল্যবান জিনিসপত্র হারানো কিংবা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আতঙ্ক তৈরি করে প্রতারকেরা সেই বিপদ থেকে মুক্তির আশ্বাস দিতেন। এভাবে তারা বিকাশ ও নগদের মাধ্যমে টাকা হাতিয়ে নিতেন। এ ছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তান্ত্রিক ও স্বনামধন্য কবিরাজ পরিচয়ে বিজ্ঞাপন দিয়ে কঠিন ও গোপন রোগের সমাধান, প্রেমে সফলতা, দাম্পত্য জীবনে সুখ এনে দেওয়াসহ নানা সমস্যার সমাধানের প্রলোভন দেখাতেন।’
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মাজিদুল হক খান জানান, মঙ্গলবার রাজবাড়ী আদালতে দুজন ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। পরে আদালতের নির্দেশে তাঁদের কারাগারে পাঠানো হয়।