.jpg)
বরিশালের হিজলা উপজেলায় মেঘনা নদীতে জেলেদের সঙ্গে নৌপুলিশের সংঘর্ষের ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হয়ে আকতার হোসেন হাওলাদার (৪০) নামে এক জেলের মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় আরও চার জেলে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। আহতদের বিভিন্ন স্থানে গোপনে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে। বুধবার (২৮ অক্টোবর) দিবাগত শেষরাতে হিজলা উপজেলার গৌরবদী ইউনিয়নের শাওড়া অরাকুল মাছঘাটসংলগ্ন নদী এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।
নিহত আকতার হোসেন হিজলার মেমানিয়া ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের চর মেমানিয়া গ্রামের বাসিন্দা সুলতান হাওলাদারের ছেলে। বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) দুপুর পর্যন্ত তাঁর মরদেহ হিজলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রাখা ছিল।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, মা ইলিশ সংরক্ষণে মাছ ধরার ওপর ২১ দিনের নিষেধাজ্ঞার শেষ দিনে এ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। নিষেধাজ্ঞা চলাকালে অভিযান ছিল ঢিলেঢালা ও নামমাত্র—এমন অভিযোগ তুলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা। তাঁদের দাবি, শেষ দিনে অভিযানের কঠোরতা দেখাতে গিয়ে গুলি চালানোর ঘটনা ঘটেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার রাতে আকতার হোসেন ও তাঁর সহযোগীরা মাছ ধরতে মেঘনা নদীতে যান। রাতের শেষভাগে হিজলার গৌরবদী ইউনিয়নের শাওড়া অরাকুল মাছঘাটের কাছে অভিযানে থাকা একটি দলের সঙ্গে তাঁদের সংঘর্ষ বাধে। এ সময় আত্মরক্ষার কথা বলে অভিযানকারী দলের সদস্যরা এলোপাতাড়ি গুলি ছোড়েন বলে জানা গেছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন পর্যায়ের এক কর্মকর্তা জানান, লক্ষ্মীপুরের রায়পুর-সংলগ্ন মেঘনা নদীতে মা ইলিশ রক্ষার অভিযানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা নিয়োজিত ছিলেন। ওই সময় জেলেদের সঙ্গে অভিযানকারী দলের সংঘর্ষ হয়। একপর্যায়ে আত্মরক্ষার্থে ছোড়া গুলি আকতার হোসেনের বুকে লাগে। এতে আরও চার জেলে গুলিবিদ্ধ হন। গুরুতর আহত আকতারকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বরিশাল শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। তবে সেখানে পৌঁছানোর আগেই তাঁর মৃত্যু হয়। পরে তাঁর মরদেহ হিজলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রাখা হয়। ঘটনার পর আহত অন্য জেলেরা আত্মগোপনে চলে গেছেন বলেও জানান ওই কর্মকর্তা।
আহত জেলেদের কাছ থেকে ঘটনার বিবরণ শুনে নিহতের বোন সাথী আক্তার স্থানীয় সংবাদকর্মীদের জানান, তাঁর ভাই আকতার হোসেন হাওলাদারসহ কয়েকজন বুধবার রাতে মাছ ধরতে নদীতে গিয়েছিলেন। বৃহস্পতিবার ভোরে হিজলার শাওড়া অরাকুল মাছঘাটসংলগ্ন এলাকায় কোস্টগার্ড ও চাঁদপুর নৌপুলিশের আকস্মিক গুলিতে তাঁর ভাই গুরুতর আহত হন বলে তিনি জানতে পেরেছেন। প্রথমে তাঁকে হিজলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য বরিশাল শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে তাঁর মৃত্যু হয়।
সাথী আক্তার আরও জানান, তাঁদের পরিবারের পক্ষ থেকে এ ঘটনায় কোনো অভিযোগ নেই। তাঁরা ময়নাতদন্ত ছাড়াই ভাইয়ের মরদেহ দাফন করতে চান।
তবে ঘটনার সময় অভিযান পরিচালনার বিষয়টি অস্বীকার করেছে কোস্টগার্ড ও নৌপুলিশের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কোস্টগার্ড দক্ষিণ জোনের গণমাধ্যম শাখার এক কর্মকর্তা জানান, ঘটনার সময় মেঘনা নদীতে তাঁদের কোনো অভিযান চলছিল না। অন্যদিকে বরিশাল অঞ্চলে নৌপুলিশের দায়িত্বে থাকা এক কর্মকর্তাও জানিয়েছেন, ওই সময় নৌপুলিশের কোনো অভিযান ছিল না।
হিজলা উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা কেএম মাহফুজুর রহমান বলেন, বৃহস্পতিবার সকালে তিনি এক জেলের মৃত্যুর খবর পেয়েছেন। বুধবার রাতে তাঁদের কোনো অভিযানকারী দল মেঘনা নদীতে যায়নি। তাঁদের স্পিডবোট দুই দিন ধরে বিকল থাকায় গত দুই দিন ছোট ট্রলার ব্যবহার করে সীমিত পরিসরে অভিযান চালানো হয়েছে। অন্য কোনো জেলার অভিযানকারী দল ওই এলাকায় অভিযান চালিয়ে থাকতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
মেমানিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আফসার উদ্দিন জানান, বৃহস্পতিবার ভোরে কয়েকজন জেলে তাঁকে খবর দেন, মেঘনা নদীতে একজন জেলেকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় ফেলে রাখা হয়েছে। খবর পেয়ে তিনি ঘটনাস্থলে গিয়ে ওই জেলেকে উদ্ধার করেন। পরে পুলিশকে জানানো হলে পুলিশ এসে তাঁকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায়। তবে কারা তাঁকে গুলি করেছে, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
হিজলা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সোলাইমান হোসেন জানান, ঘটনাটি তদন্ত করা হচ্ছে। নিহতের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে। তদন্তের ফলাফলের ভিত্তিতে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।