.jpeg)
মাগুরা পৌর যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক সাকের হোসেন হত্যার পেছনে সোনা লুটের ঘটনা এবং তা ভাগাভাগি নিয়ে বিরোধের যোগসূত্র পাওয়া যাচ্ছে। ঢাকা থেকে ভারতীয় সীমান্তে পাচারের উদ্দেশ্যে নেওয়া প্রায় ৩ কেজি ২০০ গ্রাম সোনার একটি চালান ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করেই হত্যাকাণ্ডের সূত্রপাত বলে একাধিক সূত্র দাবি করেছে।
এ ঘটনায় শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) ভোরে মাগুরা শহরের পারনান্দুয়ালী গ্রামের নিজ বাড়ি থেকে পৌর স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক মারুফ হোসেনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। এ সময় তাঁর কাছ থেকে লুট হওয়া সোনার একটি অংশ উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানা গেছে। উদ্ধার করা সোনার পরিমাণ প্রায় ৫০ ভরি।
গ্রেফতারের পর সাকের হত্যাকাণ্ড এবং সোনার চালান ছিনতাইয়ের বিষয়ে মারুফ পুলিশকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
মাগুরা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ফারুক আহমেদ মারুফের গ্রেফতারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তবে তদন্তের স্বার্থে উদ্ধার হওয়া সোনার পরিমাণসহ অন্যান্য তথ্য প্রকাশ করতে চাননি তিনি। ওসি জানান, মারুফকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বেরিয়ে আসবে বলে আশা করছে পুলিশ।
এদিকে সোনা লুট ও পরবর্তী সময়ে এর ভাগ-বাটোয়ারার সঙ্গে জেলা শহরে বসবাসকারী যুবদলের কয়েকজন নেতা ছাড়াও বিএনপি ও স্বেচ্ছাসেবক দলের শীর্ষ পর্যায়ের কয়েকজন নেতার সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে। মারুফ গ্রেফতার হওয়ার পর তাঁদের অনেকেই আত্মগোপনে চলে গেছেন বলে বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে।
গত বুধবার (২১ অক্টোবর) ভোরে মাগুরা বাস টার্মিনালে রয়েল এক্সপ্রেসের টিকিট কাউন্টারের ভেতরে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান সাকের হোসেন। তিনি শহরের পারনান্দুয়ালী গ্রামের মৃত কুতুব উদ্দিনের ছেলে। দীর্ঘদিন ধরে ওই পরিবহণ কাউন্টারে কাউন্টার মাস্টারের দায়িত্ব পালন করছিলেন তিনি।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, ঘটনার দিন ভোর সাড়ে ৫টার দিকে মোটরসাইকেলে করে দুই যুবক সেখানে আসে। পরে তারা কাউন্টারের ভেতরে ঢুকে সাকেরকে লক্ষ্য করে গুলি চালিয়ে দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে।
গুলিবিদ্ধ সাকেরকে স্থানীয়রা মাগুরা ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করেন। তবে হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই তাঁর মৃত্যু হয়। এ সময় হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের কেউ কেউ সাকের স্ট্রোক করে মারা গেছেন বলে প্রচার করতে থাকেন। দ্রুত মরদেহ বাড়িতে নিয়ে দাফনের প্রস্তুতিও শুরু করা হয়।
কিন্তু বাড়িতে নেওয়ার পর তাঁর মাথা থেকে রক্ত বের হতে দেখে পরিবারের সদস্যদের সন্দেহ হয়। পরে তাঁরা আবার মরদেহ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে ময়নাতদন্তের সময় মাথার ভেতর থেকে একটি গুলি উদ্ধার করা হয়। এর মধ্য দিয়ে সাকেরের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সামনে আসে।
এ ঘটনায় তাঁর স্ত্রী শারমিন নাহার মাগুরা সদর থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলার পর ঘটনার রাতেই সাকেরের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও ঢাকা মহানগর যুবদলের সদস্য রনি শিকদার এবং তাঁর বান্ধবী শামীমা তাবাসসুম লুবনাকে সন্দেহভাজন হিসেবে আটক করে পুলিশ।
পুলিশের একটি সূত্র জানিয়েছে, তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদের সময়, বিশেষ করে লুবনার কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের সূত্র ধরে সোনা লুটের বিষয়টি তদন্তে সামনে আসে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ডের অন্তত সাত দিন আগে সাকের তাঁর বান্ধবী লুবনার মাধ্যমে ঢাকা থেকে ভারতীয় সীমান্তের দিকে পাঠানো বিপুল পরিমাণ সোনার একটি চালান পাচারের তথ্য জানতে পারেন। এরপর রাজনৈতিক দলের ঘনিষ্ঠ কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে তিনি মাগুরা-ফরিদপুর সড়কের রামনগর এলাকায় ঢাকাগামী একটি পরিবহণের গতিরোধ করেন।
ওই পরিবহণে থাকা এক নারী যাত্রীর কাছে প্রায় ৩ কেজি ২০০ গ্রাম সোনা ছিল। সাকের ও তাঁর সহযোগীরা ওই নারীর কাছ থেকে পুরো চালানটি ছিনিয়ে নেন বলে সূত্রগুলোর দাবি।
পরবর্তী সময়ে লুট করা সোনা নিজেদের মধ্যে বণ্টন করা নিয়ে সাকেরের সঙ্গে তাঁর সহযোগীদের বিরোধ বাধে। একপর্যায়ে সেই বিরোধের জের ধরে তাঁকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয় এবং পরিকল্পনা অনুযায়ীই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে বলে দাবি সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর। তবে সোনা লুটের ঘটনার সঙ্গে সাকের হত্যার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা এখনো তদন্ত করে দেখছে পুলিশ।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মাগুরা গোয়েন্দা পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) কামরুজ্জামান জানিয়েছেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা মারুফ হোসেন হত্যাকাণ্ড ও সোনা-সংক্রান্ত বিষয়ে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। তাঁকে আদালতে হাজির করার প্রস্তুতি চলছে। ঘটনার বিষয়ে আরও বিস্তারিত জানতে তাঁর বিরুদ্ধে রিমান্ডের আবেদন করা হবে।
এ ছাড়া হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে এর আগে অনিমেষ মজুমদার নামে এক স্বর্ণ ব্যবসায়ীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাঁকেও আদালতে হাজির করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তা।
অন্যদিকে স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা মারুফ হোসেন গ্রেফতার হওয়ার পর এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে মাগুরা জেলা জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক গোলাম জাহিদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি।
তবে সংগঠনটির সদস্যসচিব আবদুর রহিম জানিয়েছেন, দলের নীতি ও শৃঙ্খলাবিরোধী কোনো কর্মকাণ্ডে কারও জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলে তাঁর বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।