জুলাই আন্দোলনের সময় মোহাম্মদপুরে গুলিতে স্ত্রী নিহত হওয়ার অভিযোগ তুলে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৮৪ জনের বিরুদ্ধে করা একটি মামলাকে ভুয়া বলে উল্লেখ করেছে পুলিশ। তদন্তে এমন কোনো হত্যাকাণ্ডের তথ্য না পাওয়ার কথা জানিয়ে মামলার সব আসামিকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে মামলার বাদী মো. সুমনের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন করা হয়েছে।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদপুর থানার এসআই শাহাদাত হোসেন গত ২৭ এপ্রিল আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, বাদী যে ফাতেমা নামে নারীর মৃত্যুর দাবি করেছেন, বাস্তবে তাঁর সঙ্গে ওই নারীর কোনো সম্পর্কের তথ্য পাওয়া যায়নি। এমনকি জিজ্ঞাসাবাদে সুমন নিজেই স্বীকার করেছেন, তিনি ফাতেমা নামে কাউকে চেনেন না এবং ওই নামে কেউ নিহত হয়েছেন বলেও তাঁর জানা নেই।
মামলার এজাহারে বলা হয়েছিল, ২০২৪ সালের রোববার (৪ আগস্ট) মোহাম্মদপুরে আন্দোলনের সময় গুলিতে নিহত হন সুমনের স্ত্রী ফাতেমা। পরে চলতি বছরের শুক্রবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) আদালতে মামলাটি দায়ের করা হয়। এতে শেখ হাসিনাসহ সাবেক সরকারের ৮৪ জনকে আসামি করা হয়। আসামিদের মধ্যে ছিলেন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, সাবেক প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু, সাবেক আইজিপি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন, সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান এবং হারুন-অর-রশীদসহ পুলিশের কয়েকজন সাবেক কর্মকর্তা।
তদন্ত চলাকালে এজাহারভুক্ত ছয়জনসহ মোট সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁদের মধ্যে বিল্লাল ওরফে ভাতিজা বিল্লাল নামে একজনকে ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত সন্দেহে আটক করা হয়েছিল। বর্তমানে তিনি জামিনে থাকলেও অন্য গ্রেপ্তার আসামিরা কারাগারে রয়েছেন। তদন্ত প্রতিবেদনে তাঁদের সবাইকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে।
পুলিশের প্রতিবেদনে বলা হয়, বাদীর দেওয়া তথ্য-প্রমাণ যাচাই করতে গিয়ে অসংগতি পাওয়া যায়। ফাতেমাকে আশুলিয়ার ইয়ারপুর কবরস্থানে দাফনের কথা বলা হলেও সেখানে গিয়ে এমন কোনো তথ্য পায়নি পুলিশ। কবরস্থান কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ওই কবরস্থান সবার জন্য উন্মুক্ত নয় এবং বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে নিহত কারও লাশ সেখানে দাফন করা হয়নি।
এ ছাড়া ফাতেমার চিকিৎসা, হাসপাতালে ভর্তি বা মৃত্যুর কোনো নথিপত্রও দিতে পারেননি সুমন। মোহাম্মদপুর এলাকায় আন্দোলনের সময় নিহতদের তালিকা পর্যালোচনা করেও কোনো নারী নিহত হওয়ার তথ্য পায়নি তদন্ত সংস্থা।
তদন্ত প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে সুমন স্বীকার করেন, কিছু ব্যক্তির প্ররোচনা ও আর্থিক লোভে পড়ে তিনি মামলাটি করেছিলেন। তবে কাদের বিরুদ্ধে কী অভিযোগ আনা হয়েছে, সে সম্পর্কেও তাঁর স্পষ্ট ধারণা ছিল না। পরে বিষয়টি বুঝতে পেরে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তাঁকে পিছিয়ে না যেতে বলা হয়। এরপর তিনি আত্মগোপনে চলে যান এবং মামলার বিষয়ে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।
এ বিষয়ে তদন্ত কর্মকর্তা শাহাদাত হোসেন একটি গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আসামিদের অব্যাহতির সুপারিশ করে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেছি। তদন্তে যা পেয়েছি সেটাই ফাইনাল রিপোর্টে উল্লেখ করেছি।’
মামলার পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য রয়েছে মঙ্গলবার (২৪ জুন)। ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জামসেদ আলম এ দিন ঠিক করেছেন বলে জানিয়েছে পুলিশের প্রসিকিউশন বিভাগ।
গ্রেপ্তার বিল্লালের আইনজীবী মোস্তফা আল মামুন একটি গণমাধ্যমকে বলেন, ‘এমন মামলা ভুরি ভুরি হচ্ছে। যে সরকার ক্ষমতায় আসে, বিরোধীদের সঙ্গে এমনটা করে। আমরা চাই না নির্দোষ কেউ হয়রানির শিকার হোক।’