
রাজধানীর বারিধারা কূটনৈতিক এলাকায় গাড়িচাপায় নির্মাণশ্রমিক মেহেদী হাসান মীর নিহতের ঘটনায় অভিযুক্ত ১৭ বছর বয়সী এক কিশোরকে জামিন দিয়েছেন আদালত। বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) সড়ক পরিবহন আইনে করা মামলায় তার জামিন আবেদনের শুনানি শেষে এ আদেশ দেন শিশু আদালত-৮-এর বিচারক মো. আবদুল মোক্তাদির। আদালতের একজন কর্মচারী জামিনের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
এর আগে ৪ থেকে ১৪ অক্টোবরের মধ্যে দুই দফায় ওই কিশোরের জামিন আবেদন প্রত্যাখ্যান করেছিলেন আদালত।
ঘটনাটি ঘটে গত ২২ সেপ্টেম্বর বিকেল ৫টার দিকে। বারিধারার ১ নম্বর সড়কের ফুটপাতে বসে ছিলেন নির্মাণশ্রমিক মেহেদী হাসান মীর। এ সময় দ্রুতগতির একটি গাড়ি ফুটপাতে উঠে তাঁকে ধাক্কা দেয়।
প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, নীলফামারীর ডোমার উপজেলার সোনাদাড়া গ্রামের বাসিন্দা মেহেদীকে গাড়ির নিচ থেকে উদ্ধার করেন স্থানীয় লোকজন। পরে তাঁকে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
আদালতের নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, এ ঘটনায় অভিযুক্ত কিশোর গুলশানের একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে ও-লেভেলে পড়াশোনা করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া দুর্ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, সংঘর্ষের পর সে গাড়ির চালকের আসন থেকে বের হয়ে আসছে।
নিহত মেহেদীর বড় ভাই মোক্তাদীর ইসলাম এ ঘটনায় মামলা করেন। দুর্ঘটনাস্থল থেকে আটক করা হলেও মামলার এজাহারে ওই কিশোরের নাম উল্লেখ করা হয়নি। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ নিয়ে ক্ষোভ তৈরি হয় এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়। এর পরদিন, ২৩ সেপ্টেম্বর, গুলশান এলাকা থেকে কিশোরটিকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
পরদিন ২৪ সেপ্টেম্বর গুলশান থানার উপপরিদর্শক (এসআই) ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আরেফিন ইসলাম তাকে আদালতে হাজির করেন। তাঁকে আটক রাখার আবেদন জানানো হলে আদালত কিশোরটিকে গাজীপুরের শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
৯ লাখ টাকায় আপসের দাবি
সেদিন আসামিপক্ষের আইনজীবী আলমগীর হোসেন দাবি করেছিলেন, ৯ লাখ টাকার বিনিময়ে বিষয়টি মীমাংসা করা হয়েছে। পরবর্তী জামিন শুনানির সময় আদালতে আপসনামাটি জমা দেওয়া হবে বলেও জানিয়েছিলেন তিনি।
আপসনামায় বলা হয়, দুর্ঘটনার সময় আকাশ মারাক গাড়িটি চালাচ্ছিলেন এবং অভিযুক্ত কিশোর গাড়ির ভেতরে ছিল। এতে আরও উল্লেখ করা হয়, নিহতের দাফন ও ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার জন্য কিশোরের পরিবার ১ লাখ টাকা দিয়েছে। এ ছাড়া মেহেদীর বৃদ্ধ বাবা-মায়ের ভবিষ্যৎ প্রয়োজন মেটানোর জন্য আরও ৮ লাখ টাকা নগদ দেওয়া হয়েছে।
আইনজীবী আলমগীর হোসেন এর আগে জানিয়েছিলেন, নিহতের পরিবারের সদস্যরা আত্মীয়স্বজন ও সাক্ষীদের উপস্থিতিতে কিশোরের পরিবারের কাছ থেকে মোট ৯ লাখ টাকা গ্রহণ করেন। পরে দুই পক্ষের মধ্যে আপসনামা সম্পন্ন হয় বলে তাঁর দাবি।
পুলিশের প্রতিবেদনে কিশোরের সংশ্লিষ্টতার ইঙ্গিত
তবে আদালতে জমা দেওয়া পুলিশের ফরওয়ার্ডিং প্রতিবেদনে ঘটনার বিষয়ে ভিন্ন তথ্য উঠে এসেছে। তদন্তকারীরা দুর্ঘটনাস্থল ও আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা করে দেখেছেন, ঘটনার পরপরই অভিযুক্ত কিশোর গাড়ির ডান পাশের চালকের দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে আসে।
প্রতিবেদনে কিশোরটিকে ‘আইনের সংস্পর্শে আসা শিশু’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়, তদন্তের প্রাথমিক পর্যায়ে এমন তথ্য পাওয়া গেছে, যা দুর্ঘটনার সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতার ইঙ্গিত দেয়।
একদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবী আপসের মাধ্যমে বিষয়টি নিষ্পত্তির দাবি করেছেন, অন্যদিকে পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদনে সিসিটিভি ফুটেজের ভিত্তিতে কিশোরটির সংশ্লিষ্টতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এ মামলায় এর আগে দুই দফা জামিন আবেদন নাকচ হওয়ার পর বৃহস্পতিবার আদালত তাকে জামিন দেন।