
মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার মধ্যে হরমুজ প্রণালিতে ইরানের নিয়ন্ত্রণমূলক অবস্থান এখন বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ইরান কার্যত একটি ‘টোল সিস্টেম’ চালু করেছে, যেখানে বড় তেলবাহী জাহাজ থেকে সর্বোচ্চ প্রায় ২০ লাখ ডলার পর্যন্ত ফি নেওয়ার ঘটনা সামনে এসেছে। তবে এই টোল কোনো নির্দিষ্ট হার নয়; 'কেস-বাই-কেস' ভিত্তিতে জাহাজের ধরন, কার্গোর পরিমাণ এবং সংশ্লিষ্ট দেশের সঙ্গে ইরানের রাজনৈতিক সম্পর্কের ভিত্তিতে ফি নির্ধারণ করা হচ্ছে।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি টোল গুনতে হচ্ছে বিশাল তেলবাহী সুপার ট্যাঙ্কারগুলোকে। এসব জাহাজে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল (ক্রুড অয়েল) থাকায় প্রতি ব্যারেল হিসাবে হিসাব করে কয়েক মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত দাবি করা হচ্ছে।
অন্যদিকে মাঝারি আকারের ট্যাঙ্কার বা সাধারণ কার্গো জাহাজের ক্ষেত্রে তুলনামূলক কম ফি নেওয়া হচ্ছে, আর ছোট বা আঞ্চলিক জাহাজের ক্ষেত্রে অনেক সময় শিথিলতাও দেওয়া হচ্ছে। পুরো প্রক্রিয়াটি নির্ধারিত কোনো টোল-রেট বা আইন নয়, বরং অনুমতি, যাচাই ও দরকষাকষির ভিত্তিতে পরিচালিত একটি নিয়ন্ত্রিত চলাচল ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে।
দেশভেদে এই টোল ব্যবস্থার পার্থক্য আরও স্পষ্ট। যুক্তরাষ্ট্র ও তার ঘনিষ্ঠ মিত্রদের জাহাজের ক্ষেত্রে কার্যত নিষেধাজ্ঞা বা কঠোর সীমাবদ্ধতা বজায় রাখা হচ্ছে। বিপরীতে চীন, ভারতসহ কিছু নিরপেক্ষ বা বন্ধুত্বপূর্ণ দেশের জাহাজকে শর্তসাপেক্ষে পার হওয়ার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে ইউয়ান বা বিকল্প মাধ্যমে অর্থ পরিশোধের তথ্যও আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, যা প্রচলিত বাণিজ্য ব্যবস্থার বাইরে একটি নতুন ধারা নির্দেশ করছে।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশি জাহাজের অবস্থান তুলনামূলকভাবে স্বস্তিদায়ক হলেও পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। আন্তর্জাতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, বাংলাদেশকে বন্ধুত্বপূর্ণ দেশ হিসেবে বিবেচনা করে অন্তত ছয়টি জ্বালানিবাহী জাহাজকে পার হওয়ার অনুমতি দিয়েছে ইরান। তবে এসব জাহাজ বাস্তবে প্রণালি অতিক্রম করেছে কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য এখনো প্রকাশ হয়নি। একইভাবে তারা ঠিক কত পরিমাণ টোল দিচ্ছে, সেটিও স্পষ্ট নয়।
তবে সামগ্রিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে ধারণা করা হচ্ছে, বাংলাদেশি জাহাজগুলো হয় কম টোল, নয়তো বিশেষ কূটনৈতিক ব্যবস্থার মাধ্যমে পার হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। কারণ, ইরান নিজেই কিছু দেশকে আলাদা সুবিধা দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে এবং জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে বন্ধুত্বপূর্ণ দেশগুলোর ক্ষেত্রে নমনীয়তা দেখাচ্ছে। ফলে বাংলাদেশি জাহাজের ক্ষেত্রে মিলিয়ন ডলারের উচ্চ টোল আরোপের সম্ভাবনা তুলনামূলক কম বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকেরা।
হরমুজ প্রণালির এই অস্বাভাবিক পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও অর্থনীতিতে বড় ধরনের চাপ তৈরি হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশেষ করে আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে, যেখানে প্রতিটি জাহাজের যাত্রাই এখন শুধু বাণিজ্য নয়, বরং ভূরাজনৈতিক সমীকরণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।