
ভারতের তরফ থেকে প্রয়োজনীয় নীতিগত অনুমোদন না পাওয়ায় আগামীকাল সোমবার (১৫ জুন) থেকে বাংলাদেশে মাত্র ৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ রপ্তানি শুরু করতে যাচ্ছে নেপাল। এবার অতিরিক্ত আরও ২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ রপ্তানির সব ধরনের প্রস্তুতি ও পরিকল্পনা থাকলেও ভারতের সেন্ট্রাল ইলেকট্রিসিটি অথরিটি (সিইএ) শেষ মুহূর্তে তার অনুমতি দেয়নি। নেপালি সংবাদমাধ্যম ‘কাঠমান্ডু পোস্ট’-এর এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
নেপালের জ্বালানি খাতের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার বিদ্যমান আন্তঃদেশীয় সঞ্চালন লাইনের (Transmission Line) সক্ষমতা সংকটের কারণ দেখিয়ে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ সরবরাহের অনুমতি আটকে দিয়েছে নয়াদিল্লি।
সঞ্চালন লাইনে জায়গা নেই, চুক্তিও বাকি
এর আগে ২০২৫ সালের ২৭ নভেম্বর ঢাকায় অনুষ্ঠিত নেপাল-ভারত জয়েন্ট স্টিয়ারিং কমিটির (জেএসসি) বৈঠকে বিদ্যমান ৪০ মেগাওয়াট ব্যবস্থার আওতায় বাংলাদেশে আরও ২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ রপ্তানি বাড়ানোর বিষয়ে নীতিগত সম্মতি হয়েছিল। এর ধারাবাহিকতায় নেপাল ইলেকট্রিসিটি অথরিটি (এনইএ) ভারতের এনটিপিসি বিদ্যুৎ ব্যাপার নিগম লিমিটেডের (এনভিভিএন) কাছে আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানায়। কিন্তু পরবর্তীতে এনভিভিএন সাফ জানিয়ে দেয়, ১ হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতার ভারত-বাংলাদেশ বিদ্যমান সঞ্চালন লাইনে অতিরিক্ত এই বিদ্যুৎ বরাদ্দের মতো পর্যাপ্ত জায়গা বা ক্যাপাসিটি নেই।
এনইএর বিদ্যুৎ বাণিজ্য বিভাগের পরিচালক থার্কা বাহাদুর থাপা কাঠমান্ডু পোস্টকে বলেন, “এবার বাংলাদেশে শুধু আগের নির্ধারিত ৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎই রপ্তানি করা হবে। অতিরিক্ত ২০ মেগাওয়াটের জন্য এখনো নতুন কোনো ত্রিপক্ষীয় চুক্তি সম্পন্ন হয়নি। আমরা ভারতের সিইএর কাছে প্রক্রিয়া শুরু করলেও আমাদের জানানো হয়েছে যে, সঞ্চালন লাইনে অতিরিক্ত ২০ মেগাওয়াটের সক্ষমতা এই মুহূর্তে নেই।”
যেভাবে বাংলাদেশে আসে নেপালের বিদ্যুৎ
নেপাল প্রথমবারের মতো ২০২৪ সালের ১৫ নভেম্বর বাংলাদেশে পরীক্ষামূলকভাবে মাত্র ১২ ঘণ্টার জন্য বিদ্যুৎ রপ্তানি করেছিল। নেপালের উৎপাদিত এই জলবিদ্যুৎ প্রথমে ঢালকেবার-মুজাফফরপুর ৪০০ কেভি সঞ্চালন লাইনের মাধ্যমে ভারতে প্রবেশ করে। এরপর ভারতের বাহারামপুর থেকে বাংলাদেশের ভেড়ামারা ৪০০ কেভি লাইনের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে এসে পৌঁছায়।
বর্তমানে অনুমোদিত এই ৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ নেপালের বিখ্যাত ‘ত্রিশূলী’ ও ‘চিলিমে’ জলবিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে উৎপাদিত হচ্ছে। চুক্তি অনুযায়ী, প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে অর্থাৎ ১৫ জুন থেকে ১৫ নভেম্বর পর্যন্ত এই ৫ মাস নেপাল বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ করবে। অতিরিক্ত ২০ মেগাওয়াটের ক্ষেত্রেও একই প্রকল্প এবং একই দর অর্থাৎ প্রতি ইউনিট ৬ দশমিক ৪০ মার্কিন সেন্ট (ডলারে) কার্যকর থাকবে।
নেপালের বিদ্যুৎ বাণিজ্যে উল্লম্ফন
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নেপাল বর্ষা মৌসুমে উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ ভারত ও বাংলাদেশে রপ্তানি করলেও শীতকালে নিজেদের ঘাটতি মেটাতে আবার ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি করে থাকে। এ পর্যন্ত নেপাল প্রতিবেশী দুই দেশে মোট ১ হাজার ১৬৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ রপ্তানির অনুমোদন পেয়েছে।
২০২১ সালের অক্টোবরে ভারত প্রথম নেপাল থেকে মাত্র ৩৯ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির অনুমতি দিয়েছিল, যা এখন ধাপে ধাপে প্রায় ১,২০০ মেগাওয়াটে উন্নীত হয়েছে। ভারতের বাজারে ভারতীয় রুপিতে বিদ্যুৎ বিক্রি হলেও বাংলাদেশের সাথে নেপালের এই লেনদেন হচ্ছে মার্কিন ডলারে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসেই বিদ্যুৎ রপ্তানি করে নেপালের আয় হয়েছে ২০ দশমিক ৯৯৫২ বিলিয়ন রুপি, যা আগের বছরের একই সময়ের (১৩.১০৩৩ বিলিয়ন রুপি) তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বাংলাদেশের জন্য মোট বিদ্যুৎ রপ্তানি ৬০ মেগাওয়াটে উন্নীত করতে হলে আগামীতে অনুষ্ঠেয় নেপাল-ভারত জেএসসি এবং সচিব পর্যায়ের জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের (জেডব্লিউজি) বৈঠকে পুনরায় আলোচনা করতে হবে। এরপর ভারতের সিইএর বিশেষ অনুমোদন এবং বাংলাদেশ-ভারত-নেপালের মধ্যে নতুন ত্রিপক্ষীয় চুক্তি সই হলে তবেই বাড়তি বিদ্যুৎ পাবে বাংলাদেশ।
সূত্র: কাঠমান্ডু পোস্ট