
ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে ব্যক্তিগত সততা, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত সিদ্ধান্ত এবং আর্থিক স্বচ্ছতা অপরিহার্য বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন। তার ভাষ্য, নীতিনির্ধারকেরা লোভ-লালসার ঊর্ধ্বে থাকতে না পারলে এই খাতের দীর্ঘদিনের অনিয়ম দূর করা সম্ভব নয়।
দেশের একটি গণমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ড. ফরাসউদ্দিন বলেন, গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি কোনো রাজনৈতিক দলের প্রভাব মেনে চলেননি। আল্লাহ ছাড়া কারও কাছে মাথানত না করার মানসিকতা এবং ব্যক্তিগত আর্থিক স্বাধীনতার কারণেই নানা চাপ উপেক্ষা করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো খেলাপি ঋণ প্রায় ২০ শতাংশ কমিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছিলেন।
তিনি জানান, জাতিসংঘে চাকরির সুবাদে আর্থিকভাবে স্বচ্ছল থাকায় দায়িত্ব পালনে কোনো ধরনের অসাধু সুবিধা নেওয়ার প্রয়োজন হয়নি। এমনকি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে পাওয়া বেতনও তিনি গ্রহণ করেননি। সেই অর্থ দিয়ে দরিদ্র কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সন্তানদের জন্য একটি আবর্তক বৃত্তি তহবিল গঠন করেছিলেন।
খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে সাবেক এই গভর্নর বলেন, এক প্রভাবশালী ঋণখেলাপির নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকেও সুপারিশ এসেছিল। তবে আইনি বাধ্যবাধকতার কারণে তিনি সেই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেন।
তিনি আরও বলেন, সংসদীয় কমিটিসহ বিভিন্ন মহল থেকে চাপ থাকলেও তৎকালীন অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়ার সহযোগিতায় প্রভাবশালী ঋণখেলাপিদের বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়নি। এর ফলেই তার দায়িত্বকালে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৫ হাজার কোটি টাকা থেকে ৪ হাজার কোটি টাকায় নেমে আসে।
শাহ এ এম এস কিবরিয়ার মূল্যায়নে ড. ফরাসউদ্দিন বলেন, দলীয় রাজনীতির বাইরে থেকে দায়িত্ব পালনকালে তিনি অত্যন্ত দৃঢ় ছিলেন। তবে পরে দলীয় সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী হওয়ার পর কিছু ক্ষেত্রে বাস্তবতার কারণে নমনীয় হতে হয়েছিল। তার মতে, একজন সফল অর্থমন্ত্রীর জন্য হিসাববিদ্যার জ্ঞানের পাশাপাশি সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং সাহসী নেতৃত্বও প্রয়োজন।
বাংলাদেশ ব্যাংকে দায়িত্ব পালনকালে নেওয়া বিভিন্ন সংস্কারের কথাও তুলে ধরেন তিনি। জানান, মেধাভিত্তিক নিয়োগে প্রণোদনা, মুদ্রানীতিবিষয়ক উচ্চতর প্রশিক্ষণ এবং ব্যাংকের মালিকদের নিজেদের প্রতিষ্ঠান থেকে ইচ্ছেমতো ঋণ নেওয়া ঠেকাতে কোম্পানি আইনের বিধান কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা হয়েছিল।
ড. ফরাসউদ্দিনের মতে, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত অবস্থান, ব্যক্তিগত সততা এবং ক্ষমতার চাপের কাছে নতি স্বীকার না করার সংস্কৃতিই ব্যাংক খাতে স্থায়ী শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার সবচেয়ে কার্যকর পথ।