
জাতিসংঘের নির্ধারিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) বাস্তবায়নের অনেক আগেই বিএনপির রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও উন্নয়ন পরিকল্পনায় এর গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত ছিল বলে দাবি করেছেন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
বুধবার (১২ আগস্ট) বাংলাদেশ চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত তিন দিনব্যাপী এসডিজি বিষয়ক সম্মেলনের সমাপনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি এ দাবি করেন।
এসডিজির লক্ষ্য পূরণে দেশের প্রান্তিক পর্যায়ের হস্তশিল্পী ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের জীবনমান উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, তৃণমূলের কারিগরদের আর্থিক সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি তাদের পণ্যের সঠিক বাজার তৈরি করে স্বাবলম্বী করার একটি সমন্বিত পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এই বৃহৎ কর্মসূচি বাস্তবায়নে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাত ও এনজিওগুলোকে সম্পৃক্ত করা হবে।
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর প্রত্যাশা, বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিশ্রুতিগুলো শতভাগ বাস্তবায়ন করা গেলে এসডিজিতে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বাংলাদেশ এগিয়ে যেতে পারবে।
তিনি বলেন, গ্রামের শীতলপাটি প্রস্তুতকারী কিংবা কামারদের শুধু অর্থ বা মূলধন সহায়তা দিলেই হবে না। তাদের উৎপাদিত পণ্যের গুণগত মান বাড়ানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করতে হবে। এ জন্য উন্নতমানের কাঁচামাল সংগ্রহের সুযোগ, আধুনিক ডিজাইন এবং ব্র্যান্ডিংয়ে সহায়তা প্রয়োজন। একই সঙ্গে আলিবাবা, আমাজন ও ইবের মতো আন্তর্জাতিক অনলাইন প্ল্যাটফর্মে এসব পণ্য বিক্রির উপযোগী করে তুলতে হবে।
তার মতে, এভাবে ১০ টাকার একটি পণ্যকে মানোন্নয়নের মাধ্যমে ৩০ টাকার পণ্যে পরিণত করা সম্ভব। এতে কারিগরদের আয় বাড়বে এবং দেশে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। তবে এসব উদ্যোগকে টেকসই করতে স্বয়ংসম্পূর্ণ অর্থায়ন বা মনিটাইজেশনের কাঠামোর মধ্যে আনতে হবে।
দীর্ঘদিন উন্নয়ন পরিকল্পনার বাইরে থাকা শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীদেরও এবার পরিকল্পনার আওতায় আনার কথা জানান অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, রাজধানীতে একটি ‘থিয়েটার ডিস্ট্রিক্ট’ গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। সেখানে থিয়েটারের সঙ্গে যুক্ত আলোকসজ্জা, মেকআপ শিল্পীসহ বিভিন্ন পর্যায়ের কারিগরদের একটি নির্দিষ্ট পরিসরে একত্রিত করা হবে।
ক্রীড়া খাতকে অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে গড়ে তোলার ওপরও জোর দেন তিনি। তার বক্তব্য, খেলাধুলাকে ঘিরে থাকা বিভিন্ন খাত কাজে লাগিয়ে বড় পরিসরে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা সম্ভব। এ প্রসঙ্গে থাইল্যান্ডের ‘ওয়ান ভিলেজ ওয়ান প্রোডাক্ট’ মডেলের উদাহরণ দেন তিনি। সেখানে গ্রামের সাধারণ পণ্যের মান উন্নত করে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সেগুলো বিদেশে বাজারজাত করা হয়।
বাংলাদেশের প্রান্তিক কারিগরদেরও আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে যুক্ত করতে নীতিগত সহায়তা ও বাজেট বরাদ্দের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান আমির খসরু।
উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে শুধু সরকারের ওপর নির্ভর করলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি। এ জন্য সরকার, এনজিও ও বেসরকারি খাতের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিতে ফ্যাশন ডিজাইনার, তাঁত বিশেষজ্ঞ ও মাঠপর্যায়ের সমন্বয়কারীরা একসঙ্গে কাজ করছেন। বিভিন্ন এলাকায় পরীক্ষামূলক প্রকল্প পরিচালনার মাধ্যমে সমস্যা চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় সংশোধনও করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, সমাজের প্রতিটি শ্রেণির মানুষের জীবনমান উন্নয়ন এবং উন্নয়ন কার্যক্রমে তাদের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে মানবিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারি নীতি ও সিদ্ধান্তে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার এবং অগ্রাধিকার নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে।
অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, এসডিজি কোনো দয়া বা অনুদানের বিষয় নয়; বরং মানুষের ভেতরে থাকা সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর একটি কাঠামো। বিএনপি সরকারের আগের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার সময়েও দেশে টেকসই উন্নয়নের বিভিন্ন কাজ হয়েছে।
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর ভাষ্য, বিএনপির বর্তমান রাজনৈতিক ইশতেহার পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হলে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক এসডিজি সূচকে নির্ধারিত অবস্থানের চেয়েও আরও এগিয়ে যেতে পারবে। এটি শুধু নীতি বা কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ কোনো পরিকল্পনা নয়; এর পেছনে রয়েছে একটি মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি, যা দ্রুত বাস্তবে প্রতিফলিত হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।