
প্রায় ৫০০ কোটি টাকা ঋণ জালিয়াতির মাধ্যমে আত্মসাতের অভিযোগে এস আলম, সাবেক রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনসহ ৩৮ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অভিযোগ করেছিলেন ইসলামী ব্যাংকের কর্মকর্তা মোহাম্মদ ইয়াসিন আলী। অভিযোগ দাখিলের পর এবার তাকেই সাময়িক বরখাস্ত করেছে ইসলামী ব্যাংক।
ইসলামী ব্যাংকের ফরেন এক্সচেঞ্জ করপোরেট শাখার ফার্স্ট অ্যাসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট ইয়াসিন আলীকে মঙ্গলবার সাসপেন্ড করে ব্যাংকের ট্রেনিং একাডেমিতে পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। সাসপেনশন চলাকালে তিনি মূল বেতনের অর্ধেক পাবেন।
ওই কর্মকর্তা জানান, হেড অফিসের অনুমোদন না নিয়ে দুদকে অভিযোগ জমা দেওয়ার কারণেই ইয়াসিন আলীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
তবে ইয়াসিন আলীর বক্তব্য, ব্যাংকের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের নির্দেশনা অনুসরণ করেই তিনি দুদকে অভিযোগটি করেছিলেন। তাকে সাসপেন্ড করার কারণ এবং সাসপেনশনের শর্ত সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে চাননি।
ইসলামী ব্যাংকের আরেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশের পর তা বাংলাদেশ ব্যাংকের নজরে আসে। পাশাপাশি ব্যাংকের চেয়ারম্যানও ইয়াসিন আলীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। এরপরই তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।
ইসলামী ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ জহির হোসেন বলেন, অভিযোগকারী কর্মকর্তা হেড অফিসের অনুমোদন ছাড়াই দুদকে অভিযোগ করেছেন। এ কারণে ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগ তাকে সাময়িকভাবে সাসপেন্ড করেছে। পাশাপাশি অভিযোগের বিষয়টি খতিয়ে দেখতে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন প্রসঙ্গে জহির হোসেন বলেন, সাবেক রাষ্ট্রপতি ইসলামী ব্যাংকের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন এবং একটি প্রতিষ্ঠানের পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। তার বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ থাকলে মামলা করা যেতে পারে। তবে এজন্য যথাযথ তথ্য-প্রমাণ থাকা প্রয়োজন।
তিনি আরও জানান, গণমাধ্যমে খবর প্রকাশের পর তিনি বিষয়টি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে অবহিত করেন। তবে ইয়াসিন আলীর চাকরিচ্যুতির বিষয়ে তার কোনো ভূমিকা নেই; সিদ্ধান্তটি ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগ নিয়েছে।
গত ২৯ জুন ইসলামী ব্যাংকের ফরেন এক্সচেঞ্জ করপোরেট শাখার ফার্স্ট অ্যাসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ ইয়াসিন আলী দুদকে ওই অভিযোগ জমা দেন।
অভিযোগপত্রে বলা হয়, পারস্পরিক যোগসাজশে প্রতারণা ও জালিয়াতির মাধ্যমে ভুয়া নথি তৈরি করে ইসলামী ব্যাংক থেকে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হয়েছে। পরে ওই অর্থ আত্মসাৎ ও বিদেশে পাচার করা হয় বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। এর ফলে ব্যাংকটি আর্থিক সংকটে পড়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
অভিযোগ অনুযায়ী, সুপ্রভ কম্পোজিট নিট লিমিটেড ছিল একটি রুগ্ণ ক্ষুদ্র শিল্পপ্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটির বিনিয়োগসীমা ১০০ কোটি টাকা হলেও প্রভাব খাটিয়ে পর্যায়ক্রমে তা ২০০ কোটি এবং পরে ৫০০ কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়।
এ ছাড়া পর্যাপ্ত জামানত ও নিশ্চয়তা ছাড়াই এবং প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই না করে বড় অঙ্কের ঋণ অনুমোদন করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়, ২০১৭ সালের ২৭ জুলাই থেকে ২০২৩ সালের ৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে সংশ্লিষ্ট শাখা থেকে ঋণের প্রস্তাব হেড অফিসে পাঠানো হয়। এসব ঋণ ২০১৭ সালের ২০ জুন থেকে ২০২৩ সালের ২১ নভেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে অনুষ্ঠিত এক্সিকিউটিভ বোর্ডের সভায় অনুমোদিত হয় বলে অভিযোগে বলা হয়েছে।
আরও বলা হয়, ঋণ পরিশোধের জন্য ২০১৯ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত একাধিকবার তাগাদাপত্র ও চূড়ান্ত তাগাদাপত্র দেওয়া হলেও ঋণের অর্থ পরিশোধ করা হয়নি।
অভিযোগে প্রধান অভিযুক্ত হিসেবে সুপ্রভ কম্পোজিট নিট লিমিটেড এবং প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ ইউনুস ওরফে আলহাজ মো. ইউনুস বাদলের নাম রয়েছে। গ্যালাক্সি সোয়েটার্স অ্যান্ড ইয়ার্ন ডাইং লিমিটেড, এবিএম শামসুল হাসান, সালেহা শাহিন ও উম্মে সালমা শারমিনসহ প্রতিষ্ঠানটির কয়েকজন পরিচালককেও অভিযুক্ত করা হয়েছে।
এ ছাড়া এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ সাইফুল আলম (মাসুদ) ওরফে এস আলমের নামও অভিযোগপত্রে রয়েছে। তাকে ঋণসুবিধার একজন সুবিধাভোগী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগে ইসলামী ব্যাংকের সাবেক কয়েকজন পরিচালক, নির্বাহী কমিটির সাবেক সদস্য, সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও), সাবেক উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) এবং কয়েকজন কর্মকর্তার নামও রয়েছে।
অভিযোগকারীরা দণ্ডবিধির ৪০৬, ৪০৯, ৪২০, ৪৬৭, ৪৬৮, ৪৭১, ৪৭৭(এ), ৩৪ ও ১০৯ ধারা, দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭-এর ৫(১)(২) ধারা এবং মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর ৪ ধারায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন করেছেন।
ইসলামী ব্যাংকের ফরেন এক্সচেঞ্জ করপোরেট শাখার কর্মকর্তা মোহাম্মদ ইয়াসিন আলী বলেন, এস আলমের ঋণ অনিয়মের ঘটনায় ব্যাংকের একাধিক মামলা রয়েছে। আদালতের নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে একটি মামলার তথ্য সরবরাহের জন্য দুদককে ঋণ অনিয়মের তথ্য দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে দুদক সচিব মো. সাইদুর রহমান খান বলেন, তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর এ ধরনের কোনো অভিযোগ পাননি। কমিশন গঠন না হওয়া পর্যন্ত এসব অভিযোগ নিয়ে কাজ করার সুযোগ নেই। কমিশন গঠনের পর অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখা হবে।