
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর কর্মকর্তাদের পদোন্নতি, জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণ ও পদোন্নতি নীতিমালার বিভিন্ন বৈষম্য নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অসন্তোষ বিরাজ করছে। বিশেষ করে ৪ আগস্ট ২০২৫ তারিখে প্রণীত পদোন্নতি নীতিমালার বিভিন্ন বিধান ও প্রয়োগ নিয়ে একাধিক রিট মামলা দায়ের হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ শুধু সোনালী ব্যাংক পিএলসির সিনিয়র অফিসার ও সমমান পদ থেকে প্রিন্সিপাল অফিসার পদে পদোন্নতির জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণ ও জ্যেষ্ঠতার তালিকা প্রকাশসংক্রান্ত বিষয়ে সভা আহ্বান করায় রাষ্ট্রায়ত্ত অন্যান্য ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংক-২ শাখা থেকে ১৫ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে জারি করা সভার নোটিশ অনুযায়ী, আগামী ১৭ অক্টোবর শনিবার সকাল ১১টায় বাংলাদেশ সচিবালয়ে এ সভা অনুষ্ঠিত হবে। সভায় সভাপতিত্ব করবেন আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. আজিজুদ্দিন বিশ্বাস।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রশ্ন, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর পদোন্নতি নীতিমালা নিয়ে যখন একাধিক আইনি জটিলতা ও বৈষম্যের অভিযোগ রয়েছে, তখন শুধু একটি ব্যাংকের নির্দিষ্ট পদের জ্যেষ্ঠতা নিয়ে আলোচনা না করে সব ব্যাংকের পদোন্নতিসংক্রান্ত সমস্যা সমাধানে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না কেন?
অভিযোগ রয়েছে, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর কর্মকর্তারা পদোন্নতির যোগ্যতা অর্জনের পরও অনুমোদিত অর্গানোগ্রামের সীমাবদ্ধতা,জনতা ব্যাংকের অর্গানোগ্রাম অনুমোদন না হওয়া,শূন্যপদের সংকট, সুপারনিউমারারি পদ সমন্বয়, কাট-অফ ডেট নির্ধারণ থাকলেও পদোন্নতি কার্যকরের তারিখ না থাকা এবং উক্ত নীতিমালার পরিবর্তনের কারণে দীর্ঘদিন ধরে পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
বিশেষ করে জনতা ব্যাংক পিএলসির ২০২১ সালে যোগদানকারী কর্মকর্তারা সার্ভিস রুলস-২০২০ অনুযায়ী ৩১ ডিসেম্বর ২০২৪ তারিখে পদোন্নতির যোগ্যতা অর্জন করলেও এখনো নিয়মিত পদোন্নতি পাননি বলে অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে নতুন অর্গানোগ্রাম অনুমোদনের দীর্ঘসূত্রতা এবং সুপারনিউমারারি পদ সমন্বয়ের কারণে বিভিন্ন ব্যাচের কর্মকর্তাদের নিয়মিত পদোন্নতির সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে।
এ ছাড়া ৪ আগস্ট ২০২৫ তারিখে প্রণীত পদোন্নতি নীতিমালার বিভিন্ন শর্ত ও প্রয়োগ নিয়ে কর্মকর্তাদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। বিশেষ করে পূর্ববর্তী সার্ভিস রুলস অনুযায়ী পদোন্নতির যোগ্যতা অর্জনকারী কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে পরবর্তী সময়ে প্রণীত নীতিমালা প্রয়োগের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এসব বিষয় নিয়ে একাধিক রিট মামলা দায়ের হয়েছে বলে কর্মকর্তাদের দাবি।
পদোন্নতির নম্বর বণ্টন নিয়েও বৈষম্যের অভিযোগ
পদোন্নতি নীতিমালায় ব্যবস্থাপক হিসেবে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতার বিপরীতে নম্বর প্রদান, প্রধান কার্যালয় ও শাখায় কর্মরত কর্মকর্তাদের মধ্যে নম্বর বিভাজন, প্রতিটি ফিডার পদে ব্যবস্থাপক হিসেবে দায়িত্ব পালনের মূল্যায়ন, ব্যাংকিং ডিপ্লোমার নম্বর এবং শাখার চাবি সংরক্ষণের দায়িত্বের বিপরীতে নম্বর প্রদানের বিধান নিয়েও কর্মকর্তাদের মধ্যে মতবিরোধ ও বৈষম্যের অভিযোগ রয়েছে।
কর্মকর্তাদের দাবি, একই পদে কর্মরত এবং সমমানের যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতাসম্পন্ন কর্মকর্তাদের মধ্যে শুধু কর্মস্থল, দায়িত্ব বণ্টন কিংবা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের কারণে পদোন্নতির নম্বরে পার্থক্য সৃষ্টি হওয়া যৌক্তিক নয়। প্রধান কার্যালয় ও শাখায় কর্মরত কর্মকর্তাদের কাজের ধরন ভিন্ন হলেও উভয় ক্ষেত্রেই ব্যাংকের কার্যক্রম পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। ফলে পদোন্নতির মূল্যায়নে কর্মস্থলভিত্তিক নম্বর বিভাজনের যৌক্তিকতা পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
একইভাবে প্রতিটি ফিডার পদে ব্যবস্থাপক হিসেবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ সব কর্মকর্তার সমান নয়। অনেক কর্মকর্তা যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও কর্তৃপক্ষের পদায়নসংক্রান্ত সিদ্ধান্তের কারণে ব্যবস্থাপকের দায়িত্ব পালনের সুযোগ পান না। এ অবস্থায় শুধু ব্যবস্থাপক হিসেবে দায়িত্ব পালনের বিপরীতে অতিরিক্ত নম্বর প্রদান করা হলে সমযোগ্যতার কর্মকর্তাদের মধ্যে বৈষম্য সৃষ্টি হতে পারে।
ব্যাংকিং ডিপ্লোমা অর্জনকারী ও ডিপ্লোমাবিহীন কর্মকর্তাদের নম্বর নির্ধারণ এবং পূর্ববর্তী নীতিমালায় ডিপ্লোমার নম্বর থাকা বা না থাকার বিষয়টিও পুনর্বিবেচনার দাবি রয়েছে। একই সঙ্গে শাখার চাবি সংরক্ষণের দায়িত্বের বিপরীতে নম্বর প্রদানের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রকৃত দায়িত্ব, দায়িত্ব পাওয়ার সুযোগ এবং পদায়নগত বাস্তবতা বিবেচনা করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন কর্মকর্তারা।
এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট ও অভিন্ন নির্দেশনার অভাবে পদোন্নতির ক্ষেত্রে নম্বরসংক্রান্ত জটিলতা, অসন্তোষ এবং কর্মকর্তাদের মধ্যে বৈষম্যের অভিযোগ তৈরি হচ্ছে। তাই ১৭ অক্টোবরের সভায় এসব বিষয়ও আলোচ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি উঠেছে।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক কর্মকর্তা ঐক্য পরিষদের বক্তব্য
এ বিষয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক কর্মকর্তা ঐক্য পরিষদের আহ্বায়ক মো. মোতাহের হোসেন বলেন, “সোনালী ব্যাংকের কর্মকর্তাদের জ্যেষ্ঠতাসংক্রান্ত সমস্যার সমাধান অবশ্যই হওয়া উচিত। কিন্তু শুধু একটি ব্যাংকের সমস্যা নিয়ে মন্ত্রণালয়ের সভা কেন? রাষ্ট্রায়ত্ত অন্যান্য ব্যাংকের হাজার হাজার কর্মকর্তা যখন পদোন্নতিবঞ্চিত, তখন তাঁদের সমস্যাগুলোও সমান গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা প্রয়োজন।”
তিনি বলেন, “৪ আগস্ট ২০২৫ তারিখে প্রণীত পদোন্নতি নীতিমালার বিভিন্ন বিধান ও প্রয়োগ নিয়ে একাধিক রিট মামলা দায়ের হয়েছে। পূর্ববর্তী সার্ভিস রুলস অনুযায়ী অর্জিত পদোন্নতির যোগ্যতা পরবর্তী নীতিমালার মাধ্যমে ক্ষুণ্ন করা, কাট-অফ ডেট থাকলেও পদোন্নতি কার্যকরের তারিখ নির্ধারণ না করা, জনতা ব্যাংকের অর্গানোগ্রাম অনুমোদনে দীর্ঘসূত্রতা এবং সুপারনিউমারারি পদ সমন্বয়ের কারণে নিয়মিত পদোন্নতির সুযোগ সংকুচিত হওয়ার বিষয়গুলো সমাধান করা জরুরি।”
মো. মোতাহের হোসেন আরও বলেন, “পদোন্নতির নম্বর বণ্টনেও বিভিন্ন বৈষম্যের অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে প্রতিটি ফিডার পদে ব্যবস্থাপক হিসেবে দায়িত্ব পালনের নম্বর, প্রধান কার্যালয় ও শাখায় কর্মরত কর্মকর্তাদের নম্বর বিভাজন, ব্যাংকিং ডিপ্লোমার নম্বর থাকা বা না থাকা এবং চাবি সংরক্ষণের দায়িত্বের বিপরীতে নম্বর প্রদানের যৌক্তিকতা পর্যালোচনা করা উচিত। কারণ এসব দায়িত্ব পালনের সুযোগ অনেক ক্ষেত্রেই কর্তৃপক্ষের প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে। ফলে সমযোগ্যতার কোনো কর্মকর্তা যেন পদায়নগত কারণে পদোন্নতির প্রতিযোগিতায় বৈষম্যের শিকার না হন, তা নিশ্চিত করতে হবে।”
তিনি বলেন, “আমরা অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের কাছে দাবি জানাচ্ছি, ১৭ অক্টোবরের সভায় শুধু সোনালী ব্যাংকের জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণ নয়, রাষ্ট্রায়ত্ত সব ব্যাংকের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে পদোন্নতি নীতিমালার সকল অসংগতি, বিচারাধীন রিট মামলায় উত্থাপিত বিষয়, জ্যেষ্ঠতা, কাট-অফ ডেট, পদোন্নতি কার্যকরের তারিখ, অর্গানোগ্রাম অনুমোদন, সুপারনিউমারারি পদ সমন্বয় এবং নম্বর বণ্টনের বৈষম্য নিয়ে সমন্বিত আলোচনা করা হোক।”
তিনি আরও বলেন, “পদোন্নতি কোনো নির্দিষ্ট ব্যাংক বা ব্যাচের একক দাবি নয়; এটি যোগ্যতা অর্জনকারী প্রতিটি কর্মকর্তার ন্যায্য প্রত্যাশা। আমরা চাই সব রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের কর্মকর্তাদের জন্য স্বচ্ছ, অভিন্ন, যৌক্তিক ও বৈষম্যহীন পদোন্নতি ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হোক।”