
বদলির আদেশ জারি, নবম পে স্কেল অনুযায়ী বেতন-ভাতা এবং আগামী ঈদুল ফিতর থেকে শতভাগ উৎসব ভাতা নিশ্চিত করার জন্য সরকারকে ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়সীমা বেঁধে দিয়েছেন এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দাবি পূরণ না হলে কঠোর আন্দোলন কর্মসূচি ঘোষণার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তারা।
বুধবার (৪ নভেম্বর) সকাল ১০টায় জাতীয় প্রেস ক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিন দফা দাবি তুলে ধরেন এমপিওভুক্ত শিক্ষা জাতীয়করণ প্রত্যাশী জোটের সদস্যসচিব অধ্যক্ষ দেলাওয়ার হোসেন আজিজী।
লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, দেশের ছয় লক্ষাধিক এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারী দীর্ঘদিন ধরে তিনটি ন্যায্য দাবি বাস্তবায়নের অপেক্ষায় রয়েছেন। দাবিগুলো হলো—শিক্ষকদের বদলির ব্যবস্থা চালু, নবম পে স্কেল অনুযায়ী বেতন-ভাতা প্রদান এবং শতভাগ উৎসব ভাতা নিশ্চিত করা।
বদলির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে অধ্যক্ষ আজিজী বলেন, অনেক শিক্ষক নিজ জেলা ও এলাকার বাইরে কর্মরত থাকায় পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন জীবনযাপন করছেন। স্ত্রী-সন্তান ও অসুস্থ মা-বাবাকে রেখে দূরবর্তী স্থানে চাকরি করতে গিয়ে তাদের পারিবারিক দায়িত্ব পালনে সমস্যা হচ্ছে।
নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, তিনি পরিবারের কাছ থেকে প্রায় ১১০ কিলোমিটার এবং নিজ বাড়ি থেকে ১৬৯ কিলোমিটার দূরে চাকরি করছেন। বদলি কোনো বিলাসিতা নয়, বরং শিক্ষকদের মানবিক ও পারিবারিক প্রয়োজন। তাই দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষায় থাকা শিক্ষকদের দুর্ভোগ বিবেচনায় দ্রুত বদলির আদেশ জারির দাবি জানান তিনি।
জোটের দ্বিতীয় দাবি নবম পে স্কেল অনুযায়ী বেতন-ভাতা প্রদান। এ বিষয়ে অধ্যক্ষ আজিজী বলেন, দেশের শিক্ষাব্যবস্থার বড় অংশ বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল। অথচ একই ধরনের শিক্ষাগত যোগ্যতা, দায়িত্ব ও পেশাগত মর্যাদা থাকা সত্ত্বেও বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। দ্রব্যমূল্য ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির বাস্তবতায় তাদের নবম পে স্কেল অনুযায়ী বেতন-ভাতা নিশ্চিত করা জরুরি।
তিনি জানান, জোটের কর্মসূচি ঘোষণা এবং গত ৩১ অক্টোবর দেশের শতাধিক জেলা ও উপজেলায় মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশের পরিপ্রেক্ষিতে ১ নভেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে এমপিওভুক্ত স্কুল-কলেজের শিক্ষক-কর্মচারীদের নবম পে স্কেল অনুযায়ী বেতন-ভাতা দেওয়ার জন্য অর্থ বরাদ্দ চেয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে।
সরকারের এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে সংশ্লিষ্টদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি। তবে মাদরাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের জন্য অর্থ বরাদ্দ চেয়ে এখনো অর্থ মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়নি বলে অভিযোগ করেন অধ্যক্ষ আজিজী। এ দুই ধারার শিক্ষকদের জন্যও দ্রুত প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
জোটের তৃতীয় দাবি আগামী ঈদুল ফিতর থেকে শতভাগ উৎসব ভাতা প্রদান। বর্তমানে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা মূল বেতনের ৫০ শতাংশ উৎসব ভাতা পান বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।
অধ্যক্ষ আজিজী বলেন, সারা বছর শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের পাঠদান ও মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার দায়িত্ব পালন করেন। অথচ ঈদের মতো ধর্মীয় ও পারিবারিক আনন্দের সময়েও তারা পূর্ণ উৎসব ভাতা থেকে বঞ্চিত থাকেন। এটি বৈষম্যমূলক। তাই আগামী ঈদুল ফিতর থেকেই শতভাগ উৎসব ভাতা প্রদানের সুস্পষ্ট ঘোষণা ও কার্যকর ব্যবস্থা চান তারা।
এদিকে পূর্বঘোষণা অনুযায়ী বুধবার জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালনের কথা ছিল জোটের। তবে শেষ পর্যন্ত কর্মসূচির ধরন পরিবর্তন করে প্রেস ক্লাবের ভেতরে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
এ বিষয়ে অধ্যক্ষ আজিজী বলেন, তিন দাবির মধ্যে দ্বিতীয় এবং সবচেয়ে ব্যয়বহুল দাবিটি বাস্তবায়নে সরকার উদ্যোগ নিয়েছে। পাশাপাশি রাজধানী ও আশপাশের এলাকায় চলমান শ্রমিক আন্দোলনসহ সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় শিক্ষক-কর্মচারীদের নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। এ কারণে খোলা জায়গায় অবস্থান কর্মসূচির পরিবর্তে সংবাদ সম্মেলনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
তিনি বলেন, কর্মসূচির ধরন ও স্থান পরিবর্তন করা হলেও আন্দোলন স্থগিত করা হয়নি। তিন দফা দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত তাদের আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।
অধ্যক্ষ আজিজী আরও বলেন, তারা সরকারবিরোধী কোনো আন্দোলন করছেন না। শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন, শিক্ষকদের পেশাগত মর্যাদা এবং ছয় লক্ষাধিক শিক্ষক-কর্মচারীর ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠাই এ উদ্যোগের লক্ষ্য।
সংবাদ সম্মেলন থেকে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি দ্রুত কার্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। অধ্যক্ষ আজিজী বলেন, শুধু আশ্বাস কিংবা অনির্দিষ্ট সময়ের প্রতিশ্রুতিতে তারা সন্তুষ্ট নন। আগামী ৩০ ডিসেম্বর ২০২৬-এর মধ্যে তিন দফা দাবি পূরণে সুনির্দিষ্ট ঘোষণা ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। অন্যথায় জোটের নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে কঠোর আন্দোলন কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।