
'মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী, আর হাতে রণতূর্য' জাতীয় কবির বিদ্রোহী কবিতার এই পঙক্তির জীবন্ত প্রতিনিধি তিনি, অস্ত্র হাতে ঘুরে বেরিয়েছেন বিভিন্ন রণাঙ্গনে, বুকের জমানো আরও মারাত্মক সব বুলেটের মতো তীব্র শব্দ দিয়ে বেঁধেছেন গান। রাইফেল রেখে কখনো তুলে নিয়েছেন গীটার, একজন শিল্পী- একজন যোদ্ধা আজম খান। ক্র্যাক প্লাটুনের সদস্য ছিলেন, যুদ্ধ করেছেন মেজর শফিউল্লাহর অধীনেও। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সাহসী সেই তরুণ গেরিলা হয়ে উঠেছেন দেশের ব্যান্ডসংগীতের অগ্রপথিক। জন্মদিনে তাকে স্মরণ করতে গেলে সংগীতের গৌরবের পাশাপাশি সামনে আসে রণাঙ্গনের এক তরুণ সেকশন কমান্ডারের গল্প।
তার প্রকৃত নাম মোহাম্মদ মাহবুবুল হক খান। ১৯৫০ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকার আজিমপুরে জন্ম। বাবা মোহাম্মদ আফতাবউদ্দিন খান ছিলেন তৎকালীন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা। শৈশব-কৈশোর কাটে আজিমপুর ও কমলাপুর এলাকায়। পড়াশোনা করেন ঢাকেশ্বরী স্কুল, প্রভেনশিয়াল স্কুল ও সিদ্ধেশ্বরী হাইস্কুলে। ১৯৬৮ সালে এসএসসি এবং ১৯৭০ সালে টি অ্যান্ড টি কলেজ থেকে বাণিজ্য বিভাগে উত্তীর্ণ হন। তবে মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে আর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় এগোনো হয়নি।
গণঅভ্যুত্থান থেকে রণাঙ্গন
১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময়ই পাকিস্তানি শাসনের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন আজম খান। ‘ক্রান্তি শিল্পী গোষ্ঠী’র সক্রিয় সদস্য হিসেবে গণসঙ্গীত পরিবেশন করতেন। ১৯৭১ সালে যুদ্ধ শুরু হলে বাবার অনুপ্রেরণায় তিনি পায়ে হেঁটে আগরতলা যান। সেখানে ভারতের মেলাঘর শিবিরে প্রাথমিক সামরিক প্রশিক্ষণ নেন। প্রশিক্ষণের সময় শহীদ জননী জাহানারা ইমামের জ্যেষ্ঠ পুত্র শাফী ইমাম রুমীর কাছে এলএমজি ও রাইফেল চালনাসহ বিভিন্ন কৌশল শিখেছিলেন।

মাত্র ২১ বছর বয়সে তিনি সেক্টর ২–এ কর্নেল খালেদ মোশাররফের অধীনে যুদ্ধে যোগ দেন। কুমিল্লার সালদায় প্রথম সরাসরি সম্মুখসমরে অংশ নেন। পরে তাকে ঢাকায় গেরিলা অপারেশনের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনি ছিলেন সেক্টর ২–এর একটি সেকশনের ইন-চার্জ এবং ‘ক্র্যাক প্লাটুন’-এর সদস্য।
ঢাকা ও আশপাশে একাধিক গেরিলা অভিযানে নেতৃত্ব দেন আজম খান। যাত্রাবাড়ি-গুলশান এলাকায় পরিচালিত অভিযানের মধ্যে “অপারেশন তিতাস” বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এই অভিযানে গ্যাস পাইপলাইন ধ্বংস করে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল ও হোটেল পূর্বাণীর গ্যাস সরবরাহ বিঘ্নিত করার পরিকল্পনা ছিল, যাতে বিদেশিরা বুঝতে পারে—দেশে যুদ্ধ চলছে। এক যুদ্ধে বাম কানে আঘাত পান তিনি, যা পরবর্তীকালে তার শ্রবণশক্তিতে প্রভাব ফেলে। ডিসেম্বরের মাঝামাঝি ঢাকায় প্রবেশের আগে মাদারটেকের ত্রিমোহনী এলাকায় সংঘটিত যুদ্ধে অংশ নেন।
যুদ্ধের প্রশিক্ষণ শিবিরে তার গাওয়া গান মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল—এটিও তার জীবনের এক অনন্য দিক।
সংগীতে নতুন ধারার সূচনা
স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে বন্ধুদের নিয়ে ‘উচ্চারণ’ ব্যান্ড গঠন করেন। একই বছরে বাংলাদেশ টেলিভিশনে তাদের প্রথম কনসার্ট সম্প্রচারিত হয়। ‘এতো সুন্দর দুনিয়ায় কিছুই রবে না রে’ ও ‘চার কালেমা সাক্ষী দেবে’ গান দুটি ব্যাপক সাড়া ফেলে।
পশ্চিমা পপ ও রক ঘরানার সঙ্গে দেশীয় বাস্তবতা মিশিয়ে তিনি গড়ে তোলেন ভিন্নধর্মী সঙ্গীতধারা। অনুজ সংগীতশিল্পী মাকসুদুল হক তাকে কেবল ‘পপ’ শিল্পী নয়, বরং বাংলাদেশের রক সংগীতের অগ্রপথিক হিসেবে বিবেচনা করেন।

তার জনপ্রিয় গানের মধ্যে রয়েছে—‘বাংলাদেশ (রেল লাইনের ঐ বস্তিতে)’, ‘ওরে সালেকা ওরে মালেকা’, ‘আলাল ও দুলাল’, ‘অনামিকা’, ‘অভিমানী’, ‘আসি আসি বলে’, ‘কেউ নাই আমার’, ‘ফেলে আসা দিনগুলো পিছু ডাকে’, ‘নীল নয়না’, ‘কিছু চাওয়া’, ‘বর্ষাকাল’, ‘মাটির পৃথিবীতে’, ‘পুড়ে যাচ্ছে’, ‘গুরু তোমায় সালাম’সহ আরও বহু গান।

১৯৭৪ সালে দুর্ভিক্ষের প্রেক্ষাপটে বিটিভিতে ‘রেললাইনের ওই বস্তিতে’ গান পরিবেশনের পর তা তুমুল আলোড়ন তোলে। পরবর্তীতে তার ওপর অনানুষ্ঠানিক নিষেধাজ্ঞা জারির কথাও আলোচিত হয়। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময়েও নানা প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়তে হয়েছে তাকে।
১৯৮২ সালে ‘এক যুগ’ শিরোনামে প্রথম অডিও অ্যালবাম প্রকাশিত হয়। সব মিলিয়ে তার অ্যালবামের সংখ্যা ২৫। ১৯৯৯ সালের ৩ মে তার প্রথম সিডি প্রকাশিত হয়। মৃত্যুর পর ২০১১ সালের ১১ আগস্ট ‘গুরু তোমায় সালাম’ অ্যালবাম প্রকাশ পায়।
বহুমাত্রিক প্রতিভা
সংগীতের পাশাপাশি ক্রিকেট খেলেছেন, সাঁতার শিখিয়েছেন, নাটক-চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন এবং বিজ্ঞাপনচিত্রে মডেল হয়েছেন। ২০০৩ সালে ‘গডফাদার’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন।
শেষযাত্রা ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি
দীর্ঘদিন ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াই করে ২০১১ সালের ৫ জুন সকাল ১০টা ২০ মিনিটে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি।

সংগীতে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১৯ সালে তাকে মরণোত্তর একুশে পদক এবং ২০২৫ সালে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত করে সরকার।
মুক্তিযুদ্ধের গেরিলা থেকে ব্যান্ডসংগীতের ‘গুরু’—আজম খানের জীবন বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায় হয়ে থাকবে।