
শুরু থেকে আলোচনায় থাকা বিনোদনের মেজাজে বানানো গুরুগম্ভীর রাজনৈতিক ঘরানার সিনেমা ‘ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার’ ঝড় তুলল অস্কার মঞ্চে।
চলচ্চিত্র জগতের সবচেয়ে বড় সম্মান বলে বিবেচিত ৯৮তম অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ডসের জিতল পল টমাস অ্যান্ডারসনের ‘ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানদার’ সিনেমাটি।
যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসের ডলবি থিয়েটারে রোববার সন্ধ্যায় অস্কারের জমকালো আসরে এই পুরস্কার ঘোষণা করা হয়। অস্কারের আসর সঞ্চালনা করেন যুক্তরাষ্ট্রের জনপ্রিয় কমেডিয়ান কোনান ও’ব্রায়েন। শুরুতেই তিনি বলেন, ‘এবারের অস্কার হতে যাচ্ছে রাজনৈতিক’।
সেরা সিনেমা, সেরা নির্মাতাসহ ৬ শাখায় অস্কার জিতে নিয়ে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দেওয়া অভিনেতা লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিও অভিনীত এই সিনেমাটি।
তবে সেরা অভিনেতার অস্কার ছিটকে যাওয়ায় বড় সম্ভাবনা থাকলেও দ্বিতীয়বার আর অস্কার জয় হল না ক্যাপ্রিওর। অস্কার পেতে ১৩ শাখায় মনোনয়ন পেয়েছিল এই সিনেমাটি।
‘ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার’ সেরা পরিচালকের পুরস্কার পেলেন পল টমাস অ্যান্ডারসন।
সেরা নির্মাতার পুরস্কার জিতে অ্যান্ডারসন বলেন, “এই প্রাপ্তির জন্যআমাকে কঠোর পরিশ্রম করতে হয়েছে। আপনাদের ধন্যবাদ।”
অ্যান্ডারসন বলের তার দলের সদস্যরা সম্মানিত, এই সম্মানের ভাগীদার হওয়ার জন্য।
রসিকতা করে ৭০ বছর বয়সী অস্কারজয়ী এই নির্মাতা বলেন, “কোনো কিছু পাওয়ার আগে আপনার মনে সন্দেহ থাকতে পারে যে আপনি এটার যোগ্য কী না। কিন্তু কোনো সন্দেহ নেই আমি অস্কার পেয়ে আনন্দিত।”
তিনি বলেন, "আমি বিশ্বাস করি মানুষের আস্থা-ভরসা ও বিশ্বাস আমার উপরে আছে।"
‘ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানদার’ সিনেমার অস্কারজয়ী পরিচালক পল টমাস অ্যান্ডারসন।‘ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানদার’ সিনেমার অস্কারজয়ী পরিচালক পল টমাস অ্যান্ডারসন।
১৯৯০ সালে প্রকাশিত টমাস পিনচনের উপন্যাস ‘ভাইনল্যান্ড’ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে সিনেমাটি বানিয়েছেন পল টমাস অ্যান্ডারসন। যার সঙ্গে এ সময়ের যুক্তরাষ্ট্রের বাস্তবতার মিল পাওয়া যায়। বিপ্লব, অভিবাসন, দুর্নীতি, সংঘর্ষ, শ্বেতাঙ্গদের আধিপত্য-কী নেই এই সিনেমায়।
বলা হয়, ‘এই সিনেমা অসন্তোষ, প্রতিবাদ আর সমাজের বাইরে থাকা একাকী নায়কের গল্প, যা আজকের আমেরিকায় দেখা যায় না।’
দীর্ঘ ২০ বছর ধরে তিনি সিনেমাটি নির্মাণ করেছেন বলে জানা গেছে।
বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সিনেমাটিকে ‘সমাজের আয়না’ বলে অভিহিত করেছিলেন মূল চরিত্রাভিনেতা লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিও। তার ভাষ্যে, “আমাদের সংস্কৃতির বিভাজন আর চরম মেরুকরণকে দেখায় এই সিনেমা। যদিও সিনেমার নির্দিষ্ট কোনো বার্তা নেই, তবে চরমপন্থার একধরনের প্রভাব এখানে কাজ করেছে।”
এই সিনেমায় রাজনৈতিক ব্যঙ্গ, ব্ল্যাক কমেডি ও অ্যাকশন আছে, যার প্রশংসা করেছেন সমালোচকেরা।
দ্য গার্ডিয়ান লিখেছে, এই সিনেমা অসন্তোষ, প্রতিবাদ আর সমাজের বাইরে থাকা একাকী নায়কের গল্প, যা আজকের আমেরিকায় দেখা যায় না।
সেরা অভিনেতা-অভিনেত্রী
ডিক্যাপ্রিও বা টিমোথি শ্যালামে নন, সব জল্পনার অবসান ঘটিয়ে অস্কারে সেরা অভিনেতা হলেন ‘সিনার্স’ অভিনেতা মাইকেল বি জর্ডান।
রায়ান কুগলার পরিচালিত হরর ছবি ‘সিনার্স’–এ দ্বৈত চরিত্রে অভিনয়ের জন্য প্রথমবার চলচ্চিত্রের সর্বোচ্চ এ পুরস্কার পেলেন ৩৯ বছর বয়সী এই অভিনেতা।
সিনার্স’ একদিকে এটি যেমন হরর সিনেমা, অন্যদিকে ব্লুজ সংগীতনির্ভর মিউজিক্যাল, আবার একই সঙ্গে গ্যাংস্টার থ্রিলার। অর্থাৎ ত্রিশের দশকের মিসিসিপিকে কেন্দ্র করে নির্মিত গভীর গবেষণাভিত্তিক ঐতিহাসিক ড্রামা হল ‘সিনার্স’।
সিনেমায় যমজ ভাইয়ের চরিত্রাভিনেতা মাইকেল বি. জর্ডান যেন নতুন করে নিজেকে আবিষ্কার করেছেন।
তবু এই ছবিতে দ্বৈত চরিত্রে, স্মোকস্ট্যাক যমজ ভাই হয়ে নিজের জাত চিনিয়েছেন মাইকেল। শরীরী ভাষা ও কণ্ঠের সূক্ষ্ম পরিবর্তনের মাধ্যমে দুই ভাইকে আলাদা করে তুলেছেন নিজের দক্ষতায়।
পুরস্কার পেয়ে ছোট্ট কথায় মাইকেল বি. জর্ডান বলেন, ‘তিনি হতবাক’।
পুরস্কার হাতে কৃষ্ণাঙ্গ অভিনয়শিল্পীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে মাইকেল বি. জর্ডান বলেন, “তারা আমার আগে শুরু করেছিলেন বলেই আমি আজ এখানে আসতে পেরেছি।”
‘সিনার্স’ সিনেমার জন্য অস্কারে সেরা অভিনেতা মাইকেল বি. জর্ডান‘সিনার্স’ সিনেমার জন্য অস্কারে সেরা অভিনেতা মাইকেল বি. জর্ডান
সহশিল্পীদের প্রতি তার ভাষ্য, ‘তোমরা সবাই মিলে এই সিনেমাটি তৈরি করেছ’।
আরও বলেন, “আজ এখানে আমার বাবা এসেছেন. পরিবারের সদস্যরা এসেছেন, তারাও অভিভূত।”
সেরা অভিনেত্রী জেসি বাকলি। গোল্ডেন গ্লোব, ক্রিটিকস চয়েজ, বাফটা, অ্যাক্টার অ্যাওয়ার্ডসের পর সমালোচকরা ধারণা করেছিলেন, এই শাখায় অস্কারটি যাচ্ছে বাকলির হাতে। অস্কার মঞ্চেও চমক দেখালেন ৩৭ বছর বয়সী এই অভিনেত্রী।
চার প্রতিদ্বন্দ্বীকে পেছনে ফেলে ক্লোয়ি ঝাওয়ের ‘হ্যামনেট’ সিনেমার জন্য এ পুরস্কার পেলেন এই আইরিশ তারকা।
বাকলি অস্কার জিতে গড়লেন ইতিহাসও। কারণ তাহলে প্রথম কোনো আইরিশ অভিনেত্রী হিসেবে অস্কার জয় করলেন এই অভিনেত্রী।
‘হ্যামনেট’ সিনেমার জন্য অস্কারে সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার পেয়েছেন আইরিশ অভিনেত্রী জেসি বাকলি।‘হ্যামনেট’ সিনেমার জন্য অস্কারে সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার পেয়েছেন আইরিশ অভিনেত্রী জেসি বাকলি।
বাকলি অভিনীত ‘হ্যামনেট’ ম্যাগি ও ফ্যারেলের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত, যা উইলিয়াম শেক্সপিয়ার ও তার স্ত্রী অ্যাগনেস হ্যাথাওয়ের জীবনের ওপর ভিত্তি করে তৈরি।
এতে ১১ বছর বয়সী পুত্র হ্যামনেটের মৃত্যুতে পারিবারিক শোক, সংকট এবং শেক্সপিয়ারের বিখ্যাত নাটক ‘হ্যামলেট’ সৃষ্টির পেছনের আবেগঘন পারিবারিক কাহিনী দেখানো হয়েছে। সিনেমাতে আরও আছেন পল মেসক্যাল।
এই সিনেমা সন্তান হারানোর শোক নিয়ে। সমালোচকদের ভাষ্য, এই সিনেমায় বাকলি নিজেকে শেক্সপিয়ারের স্ত্রী অ্যাগনেস হ্যাথাওয়ের চরিত্রে নিজেকে ভাসিয়ে দিয়েছেন।
নির্মাতা ক্লোয়ি ঝাওয়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন বাকলি। কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন তার স্বামীর প্রতি।
অশ্রুস্বজল চোখে বাকলি বলেন, “আমার বাবা-মা সব সময় স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছেন।
"আজ যুক্তরাজ্যে মা দিবস, তাই আমি এটি একজন মায়ের হৃদয়ের প্রতি এই অস্কার উৎসর্গ করতে চাই। এই ভূমিকায় আমাকে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য সবাইকে ধন্যবাদ।”
পার্শ্ব চরিত্রে সেরা অভিনেতা-অভিনেত্রী
পার্শ্ব চরিত্রে সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার পেলেন অ্যামি মুলিগান; আলোচিত হরর সিনেমা 'ওয়েপনস'-এর জন্য পুরস্কার পেলেন তিনি। সেরা পার্শ্ব চরিত্রে সেরা অভিনেতার পুরস্কার পেয়েছেন শন পেন। ‘ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার’ এর অভিনেতা শন পেন এই শাখায় পুরস্কার পাওয়ার দৌঁড়ে এগিয়েই ছিলেন। ‘ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার’ সিনেমায় কর্নেল স্টিভেন জে লকজ চরিত্রে অভিনয়ের স্বীকৃতি পেলেন তিনি। এ নিয়ে তৃতীয়বার অস্কার পেলেন তিনি। তবে এদিন পুরস্কার গ্রহণ করতে আসেননি তিনি।
অস্কারে দ্বিতীয় তালিকায় আছে 'সিনার্স'; সেরা অভিনেতাসহ ৪ শাখায় অস্কার জিতেছে রায়ান কুগলারের হরর সিনেমাটি। মনোনয়নে ১৬ শাখায় নাম লিখিয়ে রেকর্ড গড়েছিল 'সিনার্স'। বাণিজ্যিকভাবে সফল ও সমালোচকদের কাছে বহুল প্রশংসিত 'সিনার্স’ সম্পর্কে বর্ণনা করা হচ্ছে এটি ‘সাংস্কৃতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ’ একটি কাজ।
তিন শাখায় অস্কার পেয়েছে 'ফ্রাঙ্কেনস্টাইন'; আর মুক্তির পর থেকে ঝড় তোলা নেটফ্লিক্সের সিনেমা ‘কে-পপ ডেমন হান্টার্স’ জিতেছে দুই শাখায় অস্কার।
চমকপ্রদ ঘটনা
অস্কারে একটি দারুণ ঘটনা ঘটেছে। প্রায় শতবর্ষের ইতিহাসে ষষ্ঠবারের মতো সেরা ‘লাইভ অ্যাকশন শর্ট ফিল্ম’ শাখায় টাই বা যৌথ জয়ের ঘটনা ঘটেছে। এই শাখায় পুরস্কার ভাগ করে নিয়েছে ‘দ্য সিঙ্গারস’ ও ‘টু পিপল এক্সচেঞ্জিং সেলাইভা’।
পুরস্কার দেন যারা
বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দিতে মঞ্চে হাজির হন একঝাঁক তারকা। ‘হ্যামনেট’ সিনেমার পল মেসকাল, ‘ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার’ এর চেইস ইনফিনিটি ও ‘মার্টি সুপ্রিম’ এর গিনেথ প্যালট্রোর মত তারকারা ছিলেন, যাদের অভিনীত চলচ্চিত্রগুলো পুরস্কারের তালিকায় থাকলেও তারা কোনো মনোনয়ন পাননি।
এছাড়া আরও ছিরেন নিকোল কিডম্যান, রবার্ট ডাউনি জুনিয়র, অ্যান হ্যাথওয়ে ও প্রিয়াঙ্কা চোপড়া।
গত বছরের অভিনয়ের সেরা চার বিভাগের পুরস্কারজয়ী এড্রিয়েন ব্রডি, মিকি ম্যাডিসন, কিরেন কালকিন ও জোয়ি সালডানাও হাজির ছিলেন মঞ্চে।
জয়ের হাসি হাসল যারা
• সেরা সিনেমা: ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার
• সেরা অভিনেত্রী: জেসি বাকলি (হ্যামনেট)
• সেরা অভিনেতা: মাইকেল বি জর্ডান (সিনার্স)
• সেরা পরিচালক: পল টমাস অ্যান্ডারসন (ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার)
• সেরা পার্শ্ব অভিনেত্রী: অ্যামি মুলিগান (ওয়েপনস)
• সেরা পার্শ্ব অভিনেতা: শন পেন (ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার)
• সেরা মৌলিক গান: গোল্ডেন: কে পপ ডেমন হান্টার্স
• সেরা মৌলিক সুর: ‘সিনার্স’, লুডওয়াগ গোরেনসেন
• সেরা রূপান্তরিত চিত্রনাট্য: ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার'
• সেরা মৌলিক চিত্রনাট্য: ‘সিনার্স’, রায়ান কুগলার
• সেরা আন্তর্জাতিক ফিচার: সেন্টিমেন্টাল ভ্যালু (নরওয়ে)
• সেরা অ্যানিমেটেড ফিচার: কে-পপ ডেমন হান্টারস
• সেরা প্রামাণ্যচিত্র: মিস্টার নোবডি অ্যাগেইস্ট পুতিন
• সেরা সিনেমাটোগ্রাফি: সিনার্স
• সেরা শব্দগ্রহণ: এফ-ওয়ান
• সেরা সম্পাদনা: 'ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার'
• সেরা ভিজ্যুয়াল ইফেক্টস: 'অ্যাভাটার: ফায়ার অ্যান্ড অ্যাশ'
• সেরা পোশাক পরিকল্পনা: 'ফ্র্যাঙ্কেস্টাইন', কেট হাউলি
• সেরা রূপসজ্জা ও কেশসজ্জা: 'ফ্র্যাঙ্কেস্টাইন'
• সেরা শিল্প নির্দেশনা: সিনার্স
• সেরা স্বল্পদৈর্ঘ্য অ্যানিমেটেড ফিল্ম: দ্য গার্ল হু ক্রাইড পার্লস
• সেরা স্বল্পদৈর্ঘ্য প্রামাণ্যচিত্র: অল দ্য এমটি রুমস
• সেরা লাইভ অ্যাকশন শর্ট: সিঙ্গার্স এবং ‘টু পিপল এক্সচেঞ্জিং সেলাইভা’
• সেরা কাস্টিং: ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার