ল্যাটিনা কুইন শাকিরা, বিশ্ব ফুটবলের উন্মাদনা আর বিশ্বকাপ মঞ্চের গানের সঙ্গে যার নাম ও গ্ল্যামার জড়িয়ে আছে, সেই কলম্বিয়ান পপ তারকার একটি পুরোনো বাংলাদেশ সফর আবারও আলোচনায় এসেছে। ২০০৭ সালে ঘূর্ণিঝড় সিডরের পর ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়াতে এসে তিনি আবেগাপ্লুত হয়েছিলেন এবং সরেজমিনে দুর্গত এলাকা ঘুরে দেখেছিলেন।
২০০৭ সালের ১৬ ডিসেম্বর ইউনিসেফের শুভেচ্ছাদূত হিসেবে তিন দিনের সফরে বাংলাদেশে আসেন শাকিরা। ঢাকায় পৌঁছানোর পর খুব বেশি সময় না থেকে তিনি দ্রুত ছুটে যান সিডরে বিধ্বস্ত দক্ষিণাঞ্চলে। সফরের দ্বিতীয় দিন তিনি পটুয়াখালীর ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় যান এবং শিশু ও দুর্গত পরিবারের সঙ্গে সময় কাটান।
তৎকালীন বিভিন্ন তথ্য অনুযায়ী, তিনি ধ্বংসস্তূপের মধ্যে শিশুদের গল্প শোনেন এবং তাদের কষ্ট বোঝার চেষ্টা করেন। সেই সফরের সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্ত ছিল ১১ বছর বয়সী নিপা নামের এক শিশুর সঙ্গে তার সাক্ষাৎ। সিডরে বাবা-মাকে হারানো ওই শিশুর কণ্ঠে শোনা শোকের গান তাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। পরে তিনি বলেন, মেয়েটি তাকে বাংলায় একটি গান শুনিয়েছিল, যার অর্থ ছিল ‘মা, তুমি যেখানেই থাকো, আমাকে একটি চিঠি লিখো।’ সেই কণ্ঠ তিনি কখনো ভুলতে পারবেন না।
শাকিরা বলেন, ‘তবে খানিক স্বস্তির ব্যাপার ছিল এখানে যে এইসব দুর্যোগ, দুঃখ আর শোকের মাঝেও আমি এই আধা-ধ্বংসপ্রাপ্ত স্কুলটিতে বাচ্চাদের খেলতে, গাইতে আর হাসতে দেখেছি। বাচ্চাদের মুখে ডাক্তার ও নার্স হওয়ার স্বপ্নের কথা শুনে আমার খুব ভালো লেগেছে... তাদের সবারই ইতিবাচক স্বপ্ন ছিল।’
আরেকটি বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘পুরো গ্রাম নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে দেখে আমি বিধ্বস্ত হয়ে গিয়েছিলাম। তাদের যা কিছু ছিল সব শেষ হয়ে গেছে... এতগুলো মানুষের জীবনহানি, যে মায়েরা তাদের সন্তানদের হারিয়েছেন, তাদের মুখ আমি কখনো ভুলব না।’
সফরের অংশ হিসেবে তিনি রাজশাহীতে ইউনিসেফের একটি প্রকল্পও পরিদর্শন করেন, যেখানে দুর্গম এলাকার শিশুরা বিভিন্ন কেন্দ্রে দিন কাটাত। শিশুদের নিয়ে কাজের দীর্ঘ অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তিনি জানান, ১৮ বছর বয়স থেকেই তিনি শিশুদের কল্যাণে কাজ শুরু করেন এবং ‘পিয়েস দেসকালসোস’ নামে একটি ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেন, যার অর্থ ‘খালি পা’।
শাকিরা আরও বলেন, ছোটবেলার অভিজ্ঞতা থেকেই তার এই কাজের অনুপ্রেরণা এসেছে। তার ভাষায়, ‘সেই মুহূর্ত থেকেই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম একদিন আমি তাদের সাহায্য করার জন্য কিছু করব।’
ইউনিসেফ কর্মকর্তাদের বরাতে জানা যায়, শাকিরার এই বাংলাদেশ সফর ছিল অনেকটাই আড়ালে, নিজের ইচ্ছাতেই তিনি প্রচার এড়িয়ে সাধারণ মানুষের জীবন কাছ থেকে দেখতে চেয়েছিলেন।
সফর শেষে তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, বাংলাদেশের শিশু ও মানুষের প্রতি আরও বেশি মনোযোগ প্রয়োজন এবং সরকার, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও সাধারণ মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগেই তাদের পাশে দাঁড়ানো সম্ভব।
প্রায় দুই দশক পর বিশ্বকাপের গ্ল্যামার ও পারফরম্যান্স নিয়ে আলোচনার মধ্যে আবারও সামনে এসেছে শাকিরার সেই বাংলাদেশ সফরের মানবিক অধ্যায়, যেখানে তিনি কেবল তারকা নন, একজন আবেগী মানুষ হিসেবেও নিজেকে দেখিয়েছিলেন।