
কক্সবাজার মানেই কি শুধু সমুদ্রসৈকত? যারা একবার কক্সবাজার থেকে দক্ষিণের পথে মেরিন ড্রাইভ ধরে হিমছড়ি হয়ে ইনানির দিকে গেছেন, তারা জানেন—সমুদ্রের এই শহরের আরও একটি গল্প আছে। সেই গল্পে ঢেউয়ের সঙ্গে মিশে থাকে পাহাড়ের সবুজ, বাতাসে থাকে লবণাক্ত গন্ধ, আর পথের দুপাশে খুলে যায় বাংলাদেশের অন্যতম সুন্দর উপকূলীয় দৃশ্যপট।
কক্সবাজার শহর পেছনে ফেলে দক্ষিণের পথে এগোতেই বদলে যেতে থাকে দৃশ্য। একদিকে বঙ্গোপসাগরের বিস্তৃত জলরাশি, অন্যদিকে সবুজ পাহাড়। মাঝখান দিয়ে চলে গেছে মেরিন ড্রাইভ। গাড়ির জানালা দিয়ে তাকালে মনে হয়, রাস্তা নয়—সমুদ্র আর পাহাড়ের মাঝখান দিয়ে এগিয়ে চলেছে একটি দীর্ঘ গল্প।
এই পথের অন্যতম আকর্ষণ হিমছড়ি। কক্সবাজার থেকে সহজেই যাওয়া যায় বলে অনেক পর্যটকই এখানে কিছু সময় কাটান। হিমছড়ির সৌন্দর্য শুধু ঝরনায় নয়; পাহাড়ি সবুজ, উঁচু-নিচু পথ এবং সমুদ্রের দিগন্ত মিলিয়ে এখানকার প্রকৃতি আলাদা এক আবহ তৈরি করে। উঁচু ভিউপয়েন্টে উঠলে নিচে দেখা যায় সমুদ্র, আর দূরে মেরিন ড্রাইভের আঁকাবাঁকা পথ।
বর্ষাকালে হিমছড়ির ঝরনা প্রাণ ফিরে পায়। পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসে জল, চারপাশের সবুজ হয়ে ওঠে আরও ঘন। তবে শুষ্ক মৌসুমে ঝরনার প্রবাহ অনেকটাই কমে যেতে পারে। তাই হিমছড়িতে গেলে শুধু ঝরনাকে কেন্দ্র করে প্রত্যাশা না রেখে পাহাড়, সমুদ্র ও ভিউপয়েন্ট—পুরো প্রকৃতিটাকেই উপভোগ করাই ভালো।
হিমছড়ি পেরিয়ে মেরিন ড্রাইভ ধরে আরও দক্ষিণে এগোলেই ইনানি। শহরের কোলাহল থেকে দূরে গিয়ে এখানে সমুদ্র যেন একটু বেশি আপন, একটু বেশি নির্জন। ইনানির সবচেয়ে আলাদা বৈশিষ্ট্য হলো সৈকতজুড়ে ছড়িয়ে থাকা বড় বড় পাথর ও প্রবালশিলা। জোয়ার-ভাটার ওপর নির্ভর করে এসব শিলা কখনো পানির নিচে থাকে, আবার কখনো উন্মুক্ত হয়ে সৈকতের চেহারাই বদলে দেয়।
ইনানির সৌন্দর্য আসলে ধীরগতির। এখানে এসে তাড়াহুড়ো করে কয়েকটি ছবি তুলে ফিরে যাওয়ার চেয়ে কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকা বেশি উপভোগ্য। ঢেউ এসে পাথরে আছড়ে পড়ে, আবার সরে যায়। পায়ের নিচে ভেজা বালু, সামনে অসীম সমুদ্র—কখনো কখনো ভ্রমণের সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্তগুলো এতটাই সহজ হয়।
বিশেষ করে ভাটার সময় পাথরগুলো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তখন সৈকতের দৃশ্য আরও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। তবে পাথুরে অংশে হাঁটার সময় সতর্ক থাকা জরুরি; ভেজা পাথর পিচ্ছিল হতে পারে এবং কিছু জায়গা ধারালোও হতে পারে।
ইনানিতে বিকেল নামার সঙ্গে সঙ্গে প্রকৃতির রং বদলাতে শুরু করে। পশ্চিম আকাশে সূর্য যখন ধীরে ধীরে নিচে নামে, সমুদ্রের ওপর ছড়িয়ে পড়ে সোনালি আলো। পাথরের গায়ে সেই আলো পড়ে তৈরি করে একেকটি আলাদা দৃশ্য।
ফটোগ্রাফির জন্যও এই সময়টি দারুণ। তবে শুধু ক্যামেরার ফ্রেমে আটকে রাখার চেষ্টা না করে কিছুটা সময় চোখের সামনে থাকা দৃশ্যটিও দেখা উচিত। কারণ সমুদ্রের সূর্যাস্ত ছবি দিয়ে পুরোপুরি বোঝানো যায় না।
কক্সবাজারের মূল সৈকতে যেখানে পর্যটকের ভিড়, দোকানপাট আর শহুরে ব্যস্ততা বেশি, হিমছড়ি–ইনানি রুট সেখানে ভ্রমণকে দেয় অন্য মাত্রা। এখানে গন্তব্যের পাশাপাশি পথটিও ভ্রমণের অংশ।
হিমছড়িতে পাহাড় ও সমুদ্রের মিলন, আর ইনানিতে সমুদ্র ও পাথরের অনন্য দৃশ্য—দুটি জায়গা মিলিয়ে তৈরি হয় একটি পূর্ণাঙ্গ উপকূলীয় ভ্রমণ।
এই রুটকে তাই শুধু ‘দুটি পর্যটনকেন্দ্র ঘুরে আসা’ বলা যায় না। এটি বরং কক্সবাজারকে নতুন করে দেখার একটি সুযোগ—যেখানে সমুদ্রের পাশাপাশি দেখা যায় পাহাড়, বন, উপকূলীয় জীবন আর মানুষের ব্যস্ততার বাইরে প্রকৃতির নিজস্ব ছন্দ।
হিমছড়ি–ইনানি ভ্রমণে আবহাওয়া ও জোয়ার-ভাটা গুরুত্বপূর্ণ। হিমছড়ির ঝরনা দেখতে চাইলে সাম্প্রতিক বৃষ্টিপাতের পর যাওয়ায় ভালো প্রবাহ পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। আর ইনানির পাথুরে সৌন্দর্য দেখতে ভাটার সময়টি বিশেষ আকর্ষণীয়।
সকাল কিংবা বিকেলের তুলনামূলক কোমল আলোও ভ্রমণের জন্য আরামদায়ক। দুপুরের কড়া রোদ এড়িয়ে সময় নিয়ে ঘোরাই ভালো।
দিন শেষে যখন মেরিন ড্রাইভ ধরে আবার কক্সবাজার শহরের দিকে ফেরা শুরু হবে, তখন হয়তো মনে হবে—আজকের ভ্রমণের সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য কোনো একটি জায়গায় ছিল না।
ছিল পুরো পথজুড়ে।
কখনো পাহাড়ের গা ঘেঁষে চলা রাস্তা, কখনো সমুদ্রের অসীম নীল, কখনো হিমছড়ির সবুজ, কখনো ইনানির পাথরে আছড়ে পড়া ঢেউ। আর সবকিছুর ভেতর দিয়ে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাওয়া শহরের কোলাহল।