
ইতিহাসের পাতা ওল্টালে কিছু মানুষের জীবনকে কেবলই এক দীর্ঘ সংগ্রামের মহাকাব্য বলে মনে হয়। ১৯৪৮ সালের সেই কালো অধ্যায় ‘নাকবা’ বা মহা-বিপর্যয় থেকে শুরু করে আজকের দিনে গাজায় চলমান নির্মম ধ্বংসযজ্ঞ—সবকিছুরই জীবন্ত সাক্ষী উম্মে মুহাম্মদ। তিনি কেবল একজন ফিলিস্তিনি বৃদ্ধা বা দাদি নন; তিনি স্বাধিকার আন্দোলনের এক জীবন্ত প্রতীক, যাঁর চোখজুড়ে রয়েছে স্বজন হারানোর সীমাহীন বেদনা আর বুকে রয়েছে অদম্য বেঁচে থাকার লড়াই।
নিচে তাঁর সেই যন্ত্রণাদগ্ধ অথচ সাহসী জীবন আলেখ্য তুলে ধরা হলো:
স্মৃতির ক্যানভাসে ১৯৪৮ সালের সেই কালো দিন
উম্মে মুহাম্মদের বয়স যখন খুবই কম, তখন ১৯৪৮ সালে জায়নবাদী মিলিশিয়াদের বুটের তলায় পিষ্ট হয়েছিল তাঁর শৈশব। নিজেদের পৈতৃক ভিটেমাটি থেকে জোরপূর্বক বিতাড়িত হওয়ার সেই দুঃসহ স্মৃতি আজও তাঁর মনে দগদগে ক্ষত হয়ে আছে। নিজের চেনা উঠোন, জলপাইয়ের বাগান আর চাবির গোছা ফেলে স্রেফ পরনের কাপড়ে সপরিবারে শরণার্থী হিসেবে জীবন শুরু করতে হয়েছিল তাঁকে। সেই যে শুরু, তারপর থেকে তাঁর পুরো জীবনটাই কেটেছে এক উদ্বাস্তু শিবির থেকে অন্য শিবিরে, যা আজও শেষ হয়নি।
গাজার ধ্বংসস্তূপে বারবার ঘর ভাঙার বেদনা
পরবর্তী সময়ে গাজা ভূখণ্ডে স্থায়ী ঠিকানা গড়ার চেষ্টা করলেও শান্তি মেলেনি তাঁর কপালে। বর্তমানের ইসরায়েলি সামরিক অভিযানে তাঁর চোখের সামনে ধুলোয় মিশে গেছে তিল তিল করে গড়ে তোলা বসতবাড়ি। কেবল ঘরবাড়িই নয়, এই নির্মম হামলায় তিনি হারিয়েছেন তাঁর বহু আদরের নাতি-নাতনি এবং সন্তানদের। ধ্বংসস্তূপের পাশে দাঁড়িয়ে যখন তিনি তাঁর চেনা ঘরটি খোঁজেন, তখন কেবলই ভেসে আসে চেনা কণ্ঠগুলোর হারিয়ে যাওয়া প্রতিধ্বনি।
“আমাদের মাটি আমাদেরই থাকবে”
সব হারিয়েও এই ফিলিস্তিনি দাদির কণ্ঠস্বর আজও দুর্বল হয়নি। পৃথিবীর বুকে টিকে থাকার এবং নিজের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে তিনি এখনও অবিচল। জীবনের শেষ প্রান্তে এসেও তাঁর এই দৃঢ়তা নতুন প্রজন্মকে আশার আলো দেখায়। নিজের ভাঙা ঘরের এক কোণে বসে তিনি বলেন: “আমাদের মাটি আমাদেরই থাকবে।” তাঁর এই একটি বাক্যই যেন কোটি ফিলিস্তিনির মনের সুপ্ত বাসনা এবং আজীবন সংগ্রামের মূল চালিকাশক্তি।
ধৈর্য ও প্রতিরোধের জীবন্ত প্রাচীর
উম্মে মুহাম্মদের জীবনের গল্পটি কেবল একজন নারীর ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়, বরং এটি সমগ্র ফিলিস্তিনি জাতির দশকের পর দশক ধরে চলা নিপীড়ন ও তাদের অদম্য প্রতিরোধের এক অনন্য দলিল। একের পর এক প্রিয় মানুষের জানাজা কাঁধে নিয়েও তিনি যেভাবে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন, তা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। তিনি প্রমাণ করেছেন যে, বোমার আঘাতে ঘর গুঁড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হলেও একটি জাতির স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে কখনও স্তব্ধ করা যায় না।
উম্মে মুহাম্মদের মতো হাজারো ফিলিস্তিনি মা-বোন আজ গাজার প্রতিটি প্রান্তে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে জীবনের জয়গান গাইছেন। শৈশবের সেই নির্বাসন থেকে শুরু করে আজকের এই বার্ধক্যের গণহত্যা—কোনো কিছুই তাঁর ভেতরের ফিলিস্তিনি সত্ত্বাকে মুছে ফেলতে পারেনি। এই অদম্য দাদিরা আছেন বলেই হয়তো ফিলিস্তিনের বুক থেকে স্বাধীনতার সূর্য উদয়ের স্বপ্ন আজও বেঁচে আছে।
সূত্র: মিডিল ইস্ট আই