
ভূ-রাজনৈতিক টানাপোড়েনের আবহে সামরিক শক্তিতে নিজেদের সক্ষমতা আরও এক ধাপ বাড়িয়ে নিল তাইওয়ান। বেইজিংয়ের ক্রমবর্ধমান আগ্রাসনের মুখে নজরদারি ও প্রতিরক্ষামূলক তৎপরতা জোরদার করতে অত্যাধুনিক ‘রোবট কুকুর’ উদ্ভাবন করেছে স্বশাসিত এই দ্বীপরাষ্ট্রটি। ইতিমধ্যে এই যান্ত্রিক চতুষ্পদীদের কার্যকারিতার সফল মহড়াও সম্পন্ন হয়েছে। অস্ত্র বহনে সক্ষম এই রোবটগুলো আগামী দিনে দক্ষিণ চীন সাগরের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ দ্বীপগুলোতে নিয়োজিত করা হতে পারে বলে জানা গেছে, যা আধুনিক প্রতিরক্ষা কৌশলে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করল।
মঙ্গলবার (২ জুন) তাইওয়ানের সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান সামরিক গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থা আনুষ্ঠানিকভাবে তিনটি রোবটিক টহল কুকুর জনসমক্ষে নিয়ে আসে। চার পায়ের এই রোবটগুলোকে বিভিন্ন ধরনের জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ সামরিক মিশন সম্পন্ন করার উপযোগী করে প্রস্তুত করা হয়েছে।
প্রদর্শিত এই তিনটি সংস্করণের একেকটির কাজ একেক রকম; যার একটি নজরদারি ও পর্যবেক্ষণ, দ্বিতীয়টি শত্রুপক্ষের গোপন তথ্য সংগ্রহ এবং তৃতীয়টি সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে অগ্নিশক্তি প্রয়োগের জন্য বিশেষভাবে তৈরি। боевой বা যুদ্ধ-সংস্করণের এই রোবটটির পিঠে একটি স্বয়ংক্রিয় আগ্নেয়াস্ত্র জুড়ে দেওয়া হয়েছে, যা বহু দূর থেকে রিমোট কন্ট্রোলের সাহায্যে নিখুঁতভাবে পরিচালনা করা সম্ভব।
তাইওয়ানের সামরিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের তথ্যমতে, এই রোবটগুলো দুর্গম পার্বত্য পথ, এবড়োখেবড়ো উপকূল কিংবা সম্ভাব্য যুদ্ধক্ষেত্রে মানব-সৈনিকদের জীবনের ঝুঁকি বহুলাংশে কমিয়ে নিরবচ্ছিন্ন টহল ও তথ্য সংগ্রহের কাজ চালিয়ে যেতে পারবে।
সংস্থাটি আরও দাবি করেছে যে, বালুকাময় সমুদ্রসৈকত, উপকূলীয় রেখা এবং মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন দূরবর্তী দ্বীপগুলোর সার্বিক নিরাপত্তা রক্ষায় এই রোবটগুলো অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখবে। বিশেষ করে যেখানে সীমিত জনবল দিয়ে এক বিশাল অঞ্চলের ওপর কড়া নজরদারি চালাতে হয়, সেখানে এই প্রযুক্তি তাইওয়ানকে কৌশলগতভাবে বিশাল সুবিধা দেবে।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, দক্ষিণ চীন সাগরে বেইজিং এবং অঞ্চলের অন্যান্য প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখতে এবং নিজেদের অবস্থান সুসংহত করতে তাইওয়ান ভবিষ্যতে এই রোবট কুকুরগুলোকে সেখানে মোতায়েন করতে পারে। বর্তমানে এই সাগরের স্প্র্যাটলি ও প্রাতাস দ্বীপপুঞ্জের প্রত্যন্ত উপকূলীয় অঞ্চলে নিয়মিত টহল দেওয়ার একটি জরুরি প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। আর এই চাহিদাকে মাথায় রেখেই তাইওয়ানের রাষ্ট্রায়ত্ত সর্বোচ্চ অস্ত্র নির্মাণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ন্যাশনাল চুং-শান ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি’ (এনসিএসআইএসটি) তিন ধরনের চতুষ্পদ যান্ত্রিক কুকুর প্রদর্শন করেছে, যা সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্তির প্রক্রিয়া চলছে।
মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘গোস্ট রোবোটিক্স’ এই রোবটগুলোর মূল কাঠামো তৈরি করেছে, যার ওপর তাইওয়ানিজ প্রকৌশলীরা নিজেদের নিজস্ব প্রযুক্তির সংযোজন ঘটিয়েছেন। এর মধ্যে একটি রোবটের পিঠে লক্ষ্যভেদী বন্দুকও জুড়ে দেওয়া হয়েছে।
এনসিএসআইএসটি-এর মিসাইল ও রকেট গবেষণা বিভাগের উপপ্রধান জেন কুয়ো-কুয়াং এ বিষয়ে জানান, তাইওয়ানের সেনাবাহিনী এ ধরনের রোবটে আগ্রহ দেখিয়েছে, তবে এখনও কোনো অর্ডার দেয়নি। তিনি বিশেষ করে উল্লেখ করেন, সেনাবাহিনী এই রোবট কুকুরগুলোকে তাইওয়ানের মূল দ্বীপ থেকে অনেক দূরের দ্বীপগুলোতে ব্যবহার করতে চায়—যেমন দক্ষিণ চীন সাগরে তাদের দাবিকৃত দ্বীপগুলোতে।
তিনি আরও যোগ করে বলেন, "আসলে মেরিন বাহিনী মনে করে, সমুদ্র সৈকত ও উপকূল এলাকায়—বিশেষ করে নানশা (স্প্র্যাটলি) এবং দংশা (প্রাতাস) দ্বীপে কোস্ট গার্ডের টহল ও পরিদর্শনের জন্য এই রোবটগুলোর খুবই জরুরি প্রয়োজন আছে।"
ভৌগোলিক বাস্তবতায় বর্তমানে সমগ্র প্রাতাস দ্বীপপুঞ্জ এবং স্প্র্যাটলি দ্বীপপুঞ্জের একটি দ্বীপ (ইতু আবা) তাইওয়ানের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তবে চীন এই অঞ্চলের প্রায় সবকটি দ্বীপ ও সামুদ্রিক জলসীমা নিজেদের বলে দাবি করে আসছে। তাইওয়ানের মূল ভূখণ্ড থেকে প্রায় ২৫০ মাইল দূরে অবস্থিত হওয়ায় এবং ভূ-কৌশলগত কারণে প্রাতাস দ্বীপপুঞ্জকে তাইওয়ানের সবচেয়ে অরক্ষিত ও ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
বর্তমানে প্রাতাস ও ইতু আবায় তাইওয়ানের কোস্ট গার্ড পাহারা দিচ্ছে, তবে সেখানে সাধারণ কোনো নাগরিকের বসবাস নেই। জনশূন্য এই বৈরী ও ঝুঁকিপূর্ণ দ্বীপগুলোর সুরক্ষায় এই রোবট কুকুরগুলো সামরিক বাহিনীর জন্য গেম-চেঞ্জার হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স ও দ্য টেলিগ্রাফ