
ওমান উপসাগরের আন্তর্জাতিক জলসীমায় মার্কিন নৌবাহিনীর চালানো বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নিখোঁজ হওয়া ৩ জন ভারতীয় নাবিকেরই করুণ মৃত্যু হয়েছে। ওমান উপকূল থেকে তাদের নিথর দেহ উদ্ধারের পর বৃহস্পতিবার (১১ জুন) দুপুরে ভারতের কেন্দ্রীয় নৌপরিবহন মন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোয়াল আনুষ্ঠানিকভাবে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। ইরানি তেল বহনের অভিযোগে পালাউয়ের পতাকাবাহী ‘এমটি সেত্তেবেলো’ নামের একটি বাণিজ্যিক ট্যাংকারে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের যুদ্ধবিমান থেকে ছোঁড়া নিখুঁত বোমার আঘাতেই এই মর্মান্তিক প্রাণহানির ঘটনাটি ঘটেছে।
নৌপরিবহন মন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোয়াল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক বার্তায় এই ঘটনাকে সামুদ্রিক খাতের জন্য একটি ‘মর্মান্তিক’ এবং অপূরণীয় ক্ষতি হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি জানান যে নরেন্দ্র মোদি সরকার এই কঠিন সময়ে শোকসন্তপ্ত পরিবারগুলোর পাশে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়েছে এবং নিহতদের স্বজনদের সব ধরনের সহায়তা দিতে সম্পূর্ণ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বেঁচে যাওয়া বাকি ২১ জন ভারতীয় ক্রুকে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনা এবং নিহতদের মরদেহ শেষকৃত্যের জন্য রাষ্ট্রীয় তত্ত্বাবধানে অবিলম্বে স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের জন্য তিনি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জরুরি নির্দেশ দিয়েছেন।
হামলার তীব্রতা ও ক্রুদের বিবরণ
পালাউয়ের পতাকাবাহী ওই তেল ট্যাংকারটিতে মোট ২৮ জন ক্রু কর্মরত ছিলেন। যার মধ্যে ২৪ জনই ভারতের নাগরিক। বাকি ৪ জন বিদেশি নাবিকের মধ্যে দুজন পাকিস্তানি, একজন ইউক্রেনীয় ও একজন রাশিয়ার বাসিন্দা। এর আগে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল যে ওমানি নৌসেনারা জাহাজটি থেকে ২১ জন ভারতীয়কে জীবিত উদ্ধার করতে পারলেও ৩ জন নিখোঁজ ছিলেন, তাদের মৃতদেহ আজ উদ্ধার হলো। মার্কিন বিমান হামলার তীব্রতায় জাহাজের ইঞ্জিন কক্ষে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের সৃষ্টি হওয়ার কারণে জাহাজের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ এখনও বেঁচে থাকা বাকি নাবিকদের সঙ্গে একটি স্থিতিশীল যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চরম বেগ পাচ্ছেন।
নয়াদিল্লির তীব্র ক্ষোভ, মার্কিন রাষ্ট্রদূত তলব
ভারত সরকার এই প্রাণঘাতী মার্কিন সামরিক অভিযানের তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেছে যে হরমুজ প্রণালি পার হওয়ার সময় ২৪ জন ভারতীয় নাগরিক আমেরিকার নৌবাহিনীর সরাসরি হামলার মুখে পড়েছেন, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। নয়াদিল্লির পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা হয়েছে যে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক এই বাণিজ্যিক জলপথে বেসামরিক জাহাজের ওপর এমন হামলা গভীর উদ্বেগজনক। একই সঙ্গে এই অঞ্চলে অবিলম্বে সামরিক উত্তেজনা হ্রাসের জন্য তারা বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রতি পুনরায় জোর আহ্বান জানিয়েছেন।
ফরাসি সংবাদ সংস্থা এএফপি নিশ্চিত করেছে যে, এই ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় নয়াদিল্লিতে নিযুক্ত ওয়াশিংটনের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত বা চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্সকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে জরুরি তলব করে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে একটি ‘কল্প আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ’ লিপি হস্তান্তর করা হয়েছে।
সেন্টকমের হামলার দায় স্বীকার
অন্যদিকে মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড বা ‘সেন্টকম’ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ এক বিবৃতির মাধ্যমে এই হামলার কথা স্বীকার করে জানিয়েছে যে পালাউয়ের পতাকাবাহী জাহাজটি মার্কিন নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ইরান থেকে অবৈধভাবে জ্বালানি তেল পরিবহনের চেষ্টা করছিল। সেন্টকমের দাবি, ওমান উপসাগরে টহলরত মার্কিন নৌসেনারা জাহাজটিকে থামার জন্য বারবার নির্দেশ দিলেও এর ক্রু বা নাবিকেরা মার্কিন বাহিনীর দেওয়া সেই দিকনির্দেশনা মানতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়। এই কারণেই মার্কিন বিমান বাহিনীর একটি যুদ্ধবিমান থেকে জাহাজটির ইঞ্জিন কক্ষ লক্ষ্য করে সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র ছোঁড়া হয় যার ফলে ট্যাংকারটি সাগরেই সম্পূর্ণ অচল হয়ে পড়ে।
পটভূমি: অবরুদ্ধ হরমুজ প্রণালী ও যুদ্ধের আবহ
মূলত গত ফেব্রুয়ারি মাসের শেষের দিকে ইরানের ওপর আমেরিকা ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে যে সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরু হয়েছে, তার পর থেকেই বিশ্বজ্বালানি সরবরাহের প্রধান রুট হরমুজ প্রণালিটি প্রায় পুরোপুরি অবরুদ্ধ হয়ে আছে। গত কয়েক সপ্তাহে চলমান একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির সময় এই আন্তর্জাতিক জলপথটি পুনরায় উন্মুক্ত করার জন্য বেশ কয়েক দফা কূটনৈতিক আলোচনা হলেও তা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই এই প্রণালিতে কঠোর বাধা দিয়ে রেখেছে, যার বিপরীতে গত এপ্রিল মাস থেকে মার্কিন প্রশাসনও ইরানি বন্দরগুলোর ওপর নিজস্ব নৌ-অবরোধ জোরদার করেছে।
ব্রিটিশ সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা ‘ইউকে মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস’ জানিয়েছে, ওমানের সোহার বন্দর থেকে প্রায় ২০ নটিক্যাল মাইল উত্তর-পূর্বে ওই ট্যাংকারটির ইঞ্জিন কক্ষে প্রথম আগুন লাগার ঘটনাটি ঘটে। একই সাথে অপর একটি ব্রিটিশ সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা ‘ভ্যানগার্ড টেক’ নিশ্চিত করেছে যে, ওমান উপকূলে অবস্থানকালে আক্রান্ত জাহাজটি থেকে একটি জরুরি বিপদ সংকেত বা এসওএস পাঠানো হয়েছিল। সেই বার্তায় জাহাজের ক্রুরা স্পষ্ট উল্লেখ করেছিলেন যে, তাদের ইঞ্জিন রুমে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে।
উল্লেখ্য, এর আগে গত সোমবার ওমানের দক্ষিণ উপকূলে আরেকটি ভারতীয় নাবিক বোঝাই ট্যাংকারে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছিল। সে সময় ওমানি কর্তৃপক্ষ আকাশপথে অভিযান চালিয়ে ২৪ জন ভারতীয় নাগরিককে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করতে পারলেও, সেই আগুনের প্রকৃত কারণ তখন জানা যায়নি।