
আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘাতের অবসান ঘটাতে যখন একটি নতুন কূটনৈতিক সমঝোতার আভাস মিলছে, ঠিক তখনই মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে নতুন উত্তেজনার পারদ চড়ালেন ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ। আন্তর্জাতিক মহলের সমস্ত চাপকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে দক্ষিণ লেবানন থেকে সেনা প্রত্যাহার না করার এবং সীমান্তবর্তী ওই অঞ্চলে সামরিক অভিযান ও সেনা উপস্থিতি বজায় রাখার সাফ ঘোষণা দিয়েছেন তিনি।
সোমবার (১৫ জুন) দেওয়া এক বিশেষ বিবৃতিতে ইসরায়েল কাৎজ জানান, নিজেদের ভূখণ্ডের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করার স্বার্থেই দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর উপস্থিতি দীর্ঘমেয়াদে অব্যাহত থাকবে। তাঁর দাবি, ইরান সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর যেকোনো ধরনের তৎপরতা রুখে দিতেই এই কড়া পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে তিনি তেহরানকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, লেবানন পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে ইরান যদি ইসরায়েলের ওপর সরাসরি কোনো হামলা চালায়, তবে তার চড়া মূল্য দিতে হবে এবং তেহরানকে কঠোর জবাব দেওয়া হবে।
এর আগে ওয়াশিংটন ও তেহরানের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা চলমান যুদ্ধের ইতি টানতে একটি প্রাথমিক ও কাঠামোগত চুক্তিতে পৌঁছানোর খবর নিশ্চিত করেন। প্রস্তাবিত ওই খসড়া চুক্তির প্রধান শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে—ইরানের ওপর জারি থাকা মার্কিন নিষেধাজ্ঞা আংশিক শিথিল করা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করা এবং ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে নতুন করে সংলাপ শুরু করা।
কূটনৈতিক সূত্রগুলোর দাবি, এই ত্রিপক্ষীয় উদ্যোগের অংশ হিসেবে লেবানন সীমান্তে চলমান যুদ্ধ ও উত্তেজনা কমানোর বিষয়টিও আলোচনার টেবিলে স্থান পেয়েছে। তবে তেল আবিবের সরকারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত এই শান্তি প্রক্রিয়ার প্রতি আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো ইতিবাচক সায় বা সমর্থন জানানো হয়নি।
প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই সংবেদনশীল ইস্যুতে প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য না করলেও তাঁর কট্টর ডানপন্থী জোট সরকারের একাধিক প্রভাবশালী মন্ত্রী এই চুক্তি নিয়ে তীব্র আপত্তি তুলেছেন। ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন গভির সাফ জানিয়ে দিয়েছেন,
"বিদেশি কোনো সমঝোতা ইসরায়েলের ওপর বাধ্যতামূলক নয় এবং নিরাপত্তার প্রশ্নে দেশটি নিজস্ব সিদ্ধান্ত নেবে।"
একই সুরে চুক্তির তীব্র সমালোচনা করে একে ইসরায়েলের জাতীয় স্বার্থবিরোধী বলে আখ্যা দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোটরিচ। অন্যদিকে, বর্তমান সরকারের কড়া সমালোচনা করে বিরোধী শিবিরের রাজনীতিক গাদি আইজেনকট বলেন, জনগণকে এত বড় ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হচ্ছে না।
এদিকে উদ্ভূত পরিস্থিতির মধ্যে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি তুরস্ক, ইরাক ও মিসরের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে টেলিফোনে পৃথক বৈঠক করেছেন। এসব আলোচনায় তিনি লেবাননে ইসরায়েলের একতরফা সামরিক অভিযান বন্ধে মুসলিম বিশ্বকে এক হওয়ার আহ্বান জানান। তাঁর মতে, যুদ্ধ-পরবর্তী এই সমঝোতা সফলভাবে কার্যকর করার ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেরও বড় ধরনের নৈতিক দায়িত্ব রয়েছে।
তবে সব আলোচনা ছাপিয়ে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী কাৎজ এটি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে—লেবানন, সিরিয়া ও গাজা সীমান্ত সংলগ্ন যে অঞ্চলগুলোকে তেল আবিব নিজেদের ‘নিরাপত্তা বলয়’ হিসেবে বিবেচনা করে, সেখানে ইসরায়েলি বাহিনীর দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান বজায় থাকবে। তিনি আরও বলেন, সীমান্ত এলাকায় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সামরিক অবকাঠামো গুঁড়িয়ে দেওয়া এবং ভবিষ্যৎ হামলার ঝুঁকি সম্পূর্ণ দূর করাই এই অনমনীয় নীতির মূল লক্ষ্য।
সমঝোতার এই খবরে ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক তোলপাড় শুরু হলেও নতুন এই বৈশ্বিক চুক্তি বাস্তবায়নে তারা শেষ পর্যন্ত কী অবস্থান নেবে, তা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে পরিষ্কার করেনি নেতানিয়াহু প্রশাসন।
সূত্র: আনাদোলু এজেন্সি