
দীর্ঘ তিন মাস ধরে চলা বিধ্বংসী যুদ্ধ ও তীব্র সামরিক উত্তেজনার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে এক ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তিতে উপনীত হয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতির মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া এই চূড়ান্ত সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের আনুষ্ঠানিক আসর বসতে যাচ্ছে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায়, যার মূল আয়োজক বা হোস্টের ভূমিকায় থাকবে দক্ষিণ এশিয়ার দেশ পাকিস্তান।
সোমবার (১৫ জুন) পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদে (পার্লামেন্ট) দেওয়া এক নীতিনির্ধারণী ভাষণে দেশটির প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এই যুগান্তকারী ঘোষণা দেন। এর আগে গত রোববার (১৪ জুন) মধ্যরাতের পর ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে এই চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার বিষয়টি প্রকাশ পায়, যার ধারাবাহিকতায় আজ তিনি সংসদে এর বিস্তারিত রূপরেখা তুলে ধরেন।
প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ জানান, আগামী শুক্রবার (১৯ জুন) জেনেভার মাটিতে এই ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তির আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষর প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে এবং মহান আল্লাহর ইচ্ছায় পাকিস্তান এই রাজকীয় অনুষ্ঠানের আয়োজন করবে। সম্পাদিত চুক্তির প্রধান শর্ত হিসেবে দুই দেশ অবিলম্বে যুদ্ধ বন্ধ করা, তেহরানের ওপর আরোপিত সব ধরনের মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যের জন্য কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি পুনরায় সচল করার বিষয়ে একটি যৌথ এজেন্ডা বা রূপরেখায় সম্মত হয়েছে।
উল্লেখ্য, গত ফেব্রুয়ারি মাসের শেষভাগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের পক্ষ থেকে ইরানের ভূখণ্ডে অতর্কিত হামলার মাধ্যমে এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের সূত্রপাত ঘটেছিল। যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই ইসলামাবাদ দুই চিরবৈরী দেশের মধ্যে বরফ গলাতে এবং মধ্যস্থতা করতে অত্যন্ত সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। এরই অংশ হিসেবে গত এপ্রিল মাসে পাকিস্তানের রাজধানীতে প্রথম দফায় প্রত্যক্ষ আলোচনার টেবিল প্রস্তুত করা হয়। প্রথম দফার সেই বৈঠক থেকে তাৎক্ষণিক কোনো চুক্তি না এলেও আলোচনার পথ বন্ধ হয়নি। পরবর্তীতে ইসলামাবাদের নিরলস দূতিয়ালির মাধ্যমে একটি সাময়িক ও ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা সম্ভব হয়, যা শেষ পর্যন্ত একটি স্থায়ী ও ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তিতে রূপ নিল।
জাতীয় পরিষদে দেওয়া আবেগঘন ভাষণে শাহবাজ শরিফ বলেন,
"আজ বিশ্ব শান্তির এক ঐতিহাসিক মাইলফলক প্রত্যক্ষ করছে। দীর্ঘ ৩ মাস ১৬ দিনের অক্লান্ত কূটনৈতিক প্রচেষ্টার পর একটি নতুন ভোরের উদয় হয়েছে, যেখানে লেবাননসহ সব ফ্রন্টে স্থায়ীভাবে সামরিক অভিযান বন্ধের ঘোষণা এসেছে।"
এই অভূতপূর্ব সাফল্যকে দুটি দেশের মধ্যকার সাধারণ কোনো দ্বিপাক্ষিক চুক্তি নয়, বরং বৈশ্বিক শান্তি, সংলাপ ও কূটনীতির এক বিশাল বিজয় হিসেবে আখ্যা দেন তিনি।
এমন এক চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মধ্যেও ধৈর্য ও রাজনৈতিক দূরদর্শিতা দেখানোর জন্য তিনি আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ও ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বকে সাধুবাদ জানান। পাশাপাশি এই দীর্ঘ শান্তি প্রক্রিয়ায় নেপথ্যে থেকে ইতিবাচক অবদান রাখার জন্য কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল-থানি, সৌদি আরবের ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান এবং তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোগানকে বিশেষভাবে ধন্যবাদ জানান। একই সাথে তিনি চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, যুক্তরাজ্য এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর আন্তরিক সহযোগিতার জন্যও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি দৃঢ়তার সাথে মন্তব্য করেন, এই ঐতিহাসিক অর্জনের মাধ্যমে বিশ্ব দরবারে পাকিস্তানের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।
নিজের বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা বাহিনী ও সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, সেনাপ্রধান যুদ্ধের আগুন নেভাতে এবং অঞ্চলে শান্তি ফিরিয়ে আনতে দিন-রাত এক করে পরিশ্রম করেছেন। আলোচনার এমন অনেক জটিল মুহূর্ত এসেছিল যখন মনে হয়েছিল সবকিছু থমকে যাবে বা ভেস্তে যাবে, কিন্তু ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির কখনো হাল ছাড়েননি। এছাড়া দেশের উপ-প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইশাক দার এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভির অসামান্য কূটনৈতিক অবদানের কথাও তিনি কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করেন।
প্রধানমন্ত্রীর এই ঐতিহাসিক বিবৃতির পর দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফও সংসদে বক্তব্য দেন এবং এই চুক্তি বাস্তবায়নে প্রধানমন্ত্রী ও সেনাপ্রধানের যৌথ প্রজ্ঞার প্রশংসা করেন। তিনি মন্তব্য করেন, রাওয়ালপিন্ডি (সেনাবাহিনী) ও ইসলামাবাদের (সরকার) মধ্যে গত ৭৫ বছর ধরে যদি এমন চমৎকার সমন্বয় ও মেলবন্ধন থাকত, তবে পাকিস্তান অতীতে আরও অনেক বড় বড় মাইলফলক অর্জন করতে পারত।
মুসলিম বিশ্বের ঐক্যের ওপর বিশেষ জোর দিয়ে প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলেন, এই সংহতি বজায় থাকলে ফিলিস্তিন ও গাজার নিপীড়িত মানুষও খুব দ্রুতই তাদের কাঙ্ক্ষিত ন্যায়বিচার পাবে। এদিকে অধিবেশনে বিরোধী দল পিটিআই-এর সিনিয়র নেতা সরদার লতিফ খোসাও সংসদে উপস্থিত থাকা ইরানি রাষ্ট্রদূত রেজা আমিরি মোঘাদ্দামকে ধন্যবাদ জানান। তবে আগামী শুক্রবার চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষর হওয়ার আগ পর্যন্ত সময়টুকুকে অত্যন্ত সংবেদনশীল ও স্পর্শকাতর আখ্যা দিয়ে তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, কোনো রকম আকস্মিক প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই এই ঐতিহাসিক চুক্তিটি সফলভাবে সম্পন্ন হবে।
সূত্র: দ্য ডন