
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে এক চরম বিস্ফোরক মন্তব্য করে দেশটির রাজনীতিতে তোলপাড় সৃষ্টি করেছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী এহুদ বারাক। তাঁর আশঙ্কা, নিজের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে নেতানিয়াহু আসন্ন সাধারণ নির্বাচন ভণ্ডুল করার অপচেষ্টা চালাতে পারেন। আর যদি সত্যিই এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়, তবে প্রয়োজনে ‘লাঠি ও পাথর হাতে’ রাস্তায় নেমে তাঁকে গদি থেকে বিতাড়ন করার জন্য দেশবাসীর প্রতি জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন বারাক।
সোমবার (১৫ জুন) আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আনাদোলুর এক প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্যের কথা জানানো হয়েছে। এর আগে, রোববার (১৪ জুন) ইসরায়েলের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম ‘কান’-কে দেওয়া একটি বিশেষ সাক্ষাৎকারে অংশ নিয়ে ৭৬ বছর বয়সী এই সাবেক সরকারপ্রধান বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর তীব্র সমালোচনা করেন। উল্লেখ্য, ১৯৯৯ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন এহুদ বারাক।
সাক্ষাৎকারে নিজের শঙ্কার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, "আমার আশঙ্কা, নেতানিয়াহু নির্বাচন বানচালের চেষ্টা করতে পারেন এবং তিনি খুব সহজেই তা করতে পারবেন।"
একই সঙ্গে দেশবাসীকে প্রতিরোধ গড়ে তোলার ডাক দিয়ে তিনি আরও যোগ করেন, "যদি তিনি এমন চেষ্টা করেন, তাহলে তাকে লাঠি ও পাথর দিয়ে মেরে সরিয়ে দেয়া ছাড়া আমাদের আর কোনও উপায় থাকবে না।"
বর্তমানে ২০২২ সালের ডিসেম্বরের শেষভাগ থেকে ইসরায়েলের রাষ্ট্রক্ষমতা পরিচালনা করছে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন কট্টরপন্থী জোট সরকার। ১৯৪৮ সালে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড দখল করে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকে বর্তমান প্রশাসনকে দেশটির ইতিহাসের অন্যতম চরমপন্থী ও উগ্র সরকার হিসেবে গণ্য করা হয়।
সাংবিধানিক নিয়ম অনুযায়ী, ইসরায়েলের পার্লামেন্ট ‘নেসেট’-এর বর্তমান মেয়াদ চলতি বছরের অক্টোবর মাসে শেষ হতে যাচ্ছে। সেই হিসেবে আগামী সেপ্টেম্বর অথবা অক্টোবরের মধ্যেই দেশটিতে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী এহুদ বারাকের দাবি, নির্বাচন প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে এবং ভোট পেছাতে নেতানিয়াহু লেবানন সীমান্তে পরিকল্পিতভাবে সামরিক উত্তেজনা বাড়াতে পারেন। তিনি এমন এক যুদ্ধাবস্থা তৈরি করতে চান যাতে হিজবুল্লাহ ও ইরান পাল্টা বড় ধরনের হামলা চালাতে বাধ্য হয়। এ প্রসঙ্গে বারাক বলেন, "নেতানিয়াহু অন্তহীন যুদ্ধ চান। কারণ তিনি বোঝেন, যুদ্ধ শেষ হলে তার বিচার প্রক্রিয়া আরও দ্রুত এগোবে।"
নেতানিয়াহুর যুদ্ধংদেহী মনোভাবের তীব্র সমালোচনা করে সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী আরও অভিযোগ করেন, "যেভাবে তিনি (নেতানিয়াহু) হামাসের সঙ্গে কিছু বন্দি বিনিময় চুক্তি বাধাগ্রস্ত করেছেন, একইভাবে লেবানন ইস্যুতেও অগ্রগতির সম্ভাবনা আটকে দিয়েছেন।"
উল্লেখ্য, প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বর্তমানে ইসরায়েলের আদালতে একাধিক দুর্নীতি ও ঘুষের মামলায় বিচারের মুখোমুখি রয়েছেন। অন্যদিকে, সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্পন্ন হওয়া ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তিরও কড়া সমালোচনা করেছেন এহুদ বারাক। ওই বৈশ্বিক সমঝোতা প্রসঙ্গে তিনি সরাসরি মন্তব্য করেন, "এক কথায়— খারাপ। দুই কথায়— (এই চুক্তি) খুবই খারাপ।"
বারাকের স্পষ্ট অভিমত, বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর দাম্ভিকতা এবং ভূরাজনৈতিক দূরদর্শিতার অভাবের কারণে আজ পুরো ইসরায়েল রাষ্ট্রকে চরম মূল্য দিতে হচ্ছে। তিনি দাবি করেন, তেহরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী আদতে কোনো লক্ষ্যই অর্জন করতে পারেনি।
এদিকে, দেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে এহুদ বারাকের এমন উসকানিমূলক ও সহিংস মন্তব্যের পর তীব্র ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক মিত্ররা। ক্ষমতাসীন লিকুদ পার্টির প্রভাবশালী আইনপ্রণেতা এবং নেসেটের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা কমিটির বর্তমান চেয়ারম্যান বোয়াজ বিসমুথ সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা ও ফৌজদারি তদন্তের জোর দাবি জানিয়েছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক বার্তায় বোয়াজ বিসমুথ বলেন, "প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে সহিংসতাকে বৈধতা দেয়ার চেষ্টা করেছেন বারাক।"
সাবেক প্রধানমন্ত্রীর মানসিক সুস্থতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি আরও বলেন, "তাকে একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে পাঠানো উচিত। আর যদি মানসিকভাবে সুস্থ প্রমাণিত হন, তাহলে তার বিরুদ্ধে অবিলম্বে ফৌজদারি তদন্ত শুরু করা উচিত।"