
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সদ্য স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক সমঝোতা স্মারকটি তেহরানের আগ্রহে নয়, বরং ওয়াশিংটনের তীব্র ব্যাকুলতা এবং নজিরবিহীন চাপের মুখে সম্পন্ন হয়েছে বলে দাবি করেছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি।
গত বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) ভারতের একটি শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যম এই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ্যে এনেছে।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি তার আনুষ্ঠানিক বার্তায় সরাসরি উল্লেখ করেছেন যে,
‘আপনাদের যেমনটা জানানো হয়েছে, ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টদ্বয়ের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে।’
তিনি স্পষ্ট করে জানান, ইরানের উচ্চপদস্থ কূটনীতিকরা অত্যন্ত সততা ও আন্তরিকতার সাথে এই আলোচনা এগিয়ে নিলেও মূলত মার্কিন প্রশাসনই এটি চূড়ান্ত করতে সবচেয়ে বেশি মরিয়া ছিল। মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিজেই চরম উপায়হীন হয়ে এই চুক্তিটি সম্পন্ন করার জন্য সব ধরনের কৌশলগত চাপ ও প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করেছেন।
নতুন এই দ্বিপাক্ষিক চুক্তি নিয়ে নিজের কিছুটা ভিন্নমতের কথা প্রকাশ করে সর্বোচ্চ নেতা জানান, নীতিগতভাবে এই চুক্তির ব্যাপারে তার ব্যক্তিগত কিছু আপত্তি ও ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি ছিল। তা সত্ত্বেও ইরানি জনগণের ন্যায্য অধিকার সুনিশ্চিত করা এবং প্রতিরোধ ফ্রন্টের সামগ্রিক স্বার্থ রক্ষা করার বিষয়ে দেশের প্রেসিডেন্ট দৃঢ় প্রতিশ্রুতি দেওয়ায়, তিনি শেষ পর্যন্ত এই সমঝোতায় নিজের চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছেন।
আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি একই সাথে ওয়াশিংটনকে কড়া ভাষায় হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, আমেরিকা যদি এই নির্ধারিত চুক্তির বাইরে গিয়ে অতিরিক্ত কোনো শর্ত বা দাবি চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে, তবে ইরান তা কোনোভাবেই বরদাশত করবে না এবং অন্যায্য দাবির কাছে মাথা নত করবে না। নিজেকে ইরানি জনগণের একজন সাধারণ সেবক হিসেবে অভিহিত করে তিনি দেশের সব নাগরিককে চুক্তির শর্তাবলী বাস্তবায়নের প্রতিটি ধাপ গভীর মনোযোগের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করার আহ্বান জানিয়েছেন।
কীভাবে ও কোথায় স্বাক্ষরিত হলো এই চুক্তি?
প্যারিসের ঐতিহাসিক ভার্সাই প্রাসাদে জি-৭ শীর্ষ সম্মেলন সমাপ্ত হওয়ার পর ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর নৈশভোজের আসরে এই সমঝোতা স্মারকটি চূড়ান্তভাবে স্বাক্ষরিত হয়। ফরাসি প্রেসিডেন্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) এই যুগান্তকারী অর্জনের কথা ঘোষণা করে লিখেছেন যে, এই চুক্তিটি মূলত একটি দীর্ঘস্থায়ী শান্তির পথ উন্মুক্ত করে এবং বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিটি পুনরায় সচল করার সুযোগ তৈরি করে দেয়।
চুক্তির মূল শর্তাবলী
‘ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক’ নামে আনুষ্ঠানিকভাবে পরিচিত এই দ্বিপাক্ষিক চুক্তির প্রধান শর্তগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
যুদ্ধবিরতি: লেবাননসহ সব ধরনের সামরিক ফ্রন্টে অবিলম্বে এবং স্থায়ীভাবে সব ধরনের যুদ্ধবিগ্রহ ও সামরিক অভিযান বন্ধ করতে হবে।
নৌ অবরোধ প্রত্যাহার: চুক্তির আওতায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আগামী ৩০ দিনের মধ্যে ইরানের ওপর আরোপিত তাদের দীর্ঘদিনের নৌ অবরোধ সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করে নিতে সম্মত হয়েছে, যাতে ওই অঞ্চলে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে।
সেনা প্রত্যাহার: চূড়ান্ত চুক্তি সই হওয়ার এক মাসের মধ্যে ইরান সীমান্তের আশপাশ থেকে ওয়াশিংটন তাদের সব সামরিক বাহিনী ও যুদ্ধজাহাজ সরিয়ে নেবে।
নিরাপদ যাতায়াত: এর জবাবে ইরানও আগামী ৬০ দিন ওই অঞ্চলে বিনা মূল্যে সব বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ সহযোগিতা প্রদান করবে।
সূত্র: এনডিটিভি