
পাকিস্তান-অধিকৃত কাশ্মীরে চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নিরাপত্তা অভিযানের কারণে জনজীবন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। স্থানীয় অধিকারভিত্তিক সংগঠন জয়েন্ট আওয়ামি অ্যাকশন কমিটির (জেএএসি) ডাকা আন্দোলন, ধর্মঘট ও পরবর্তী সংঘর্ষের জেরে বিভিন্ন শহরে বাজার, গণপরিবহন, ব্যাংকিং সেবা ও সরবরাহ ব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
পাকিস্তানি সংবাদমাধ্যম ডন, দ্য এক্সপ্রেস ট্রিবিউন ও পাকিস্তান টুডের প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে আজাদ কাশ্মীর বিধানসভায় ভারত-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীর থেকে পাকিস্তানে বসবাসকারী শরণার্থীদের জন্য সংরক্ষিত ১২টি আসন বাতিলের দাবি। ডনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জেএএসি অভিযোগ করছে, এসব আসনের মাধ্যমে পাকিস্তানের মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলো মুজাফফরাবাদের সরকার গঠনে প্রভাব বিস্তার করে।
ডনের ৫ জুনের প্রতিবেদনে জানানো হয়, ৯ জুনের বড় কর্মসূচির আগে আজাদ কাশ্মীর সরকার পর্যটক ও বাইরের লোকজনকে অঞ্চলটিতে না যেতে এবং অবস্থানরত দর্শনার্থীদের দ্রুত চলে যেতে পরামর্শ দেয়। একই সঙ্গে ইসলামাবাদ থেকে ফেডারেল প্যারামিলিটারি বাহিনী পাঠানো হয় এবং স্থানীয় পুলিশ ১৪ হাজার অতিরিক্ত সদস্য চায় বলে ডন জানায়।
পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয় রাওয়ালাকোটে সংঘর্ষের পর। দ্য এক্সপ্রেস ট্রিবিউনের প্রতিবেদনে আজাদ কাশ্মীর পুলিশের বরাতে বলা হয়েছে, রাওয়ালাকোটে জেএএসি-সমর্থকদের সঙ্গে সংঘর্ষে কয়েকজন নিহত ও আহত হন; পুলিশ দাবি করে, সশস্ত্র ব্যক্তিরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর হামলা চালায়। তবে জেএএসি এই বক্তব্য অস্বীকার করে দাবি করেছে, নিরাপত্তা বাহিনী টিয়ার গ্যাস ও শেল ব্যবহার করেছে।
সংঘর্ষের পর অঞ্চলজুড়ে ধর্মঘট ও অচলাবস্থা আরও গভীর হয়। রয়টার্সের মুজাফফরাবাদভিত্তিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় দুই সপ্তাহের বিক্ষোভে অন্তত ২৪ জন নিহত হন, যার মধ্যে ২০ জন বেসামরিক নাগরিক ও চারজন পুলিশ সদস্য। একই প্রতিবেদনে আঞ্চলিক পুলিশপ্রধানের বরাতে ৫১৫ জনকে আটক এবং ৯৭ পুলিশ সদস্য আহত হওয়ার তথ্য দেওয়া হয়েছে। সরকার প্রধান সড়ক বন্ধ, ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট ও মিডিয়া প্রবেশ সীমিত করার মতো ব্যবস্থা নিয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
মানবিক সংকটের সবচেয়ে স্পষ্ট চিত্র দেখা যায় খাদ্য, জ্বালানি ও ওষুধ সরবরাহে। পাকিস্তান টুডে ১৬ জুন জানায়, ধর্মঘট সপ্তম দিনে গড়ানোর সময় মুজাফফরাবাদসহ বিভিন্ন এলাকায় বাজার বন্ধ, গণপরিবহন স্থগিত এবং ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় ব্যাংকিং কার্যক্রম ব্যাহত হয়। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, অ্যাবোটাবাদ ও রাওয়ালপিন্ডি থেকে আসা সরবরাহ লাইন বাধাগ্রস্ত হওয়ায় বিভিন্ন জেলার ফার্মেসিতে ওষুধের তীব্র সংকট দেখা দেয়।
জ্বালানি সংকটও জনজীবনকে থামিয়ে দেয়। পাকিস্তান টুডের ২৮ জুনের প্রতিবেদনে বলা হয়, মুজাফফরাবাদে ব্যবসায়ী ও পরিবহন নেতারা প্রশাসনের কাছ থেকে নিরাপত্তা ও নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহের আশ্বাস পাওয়ার পর বাজার ও গণপরিবহন চালুর ঘোষণা দেন। পরিবহন নেতারা জানান, সড়ক অবরোধ ও জ্বালানি সংকটের কারণে বাস-গাড়ি চালু রাখা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছিল।
তবে ‘সরকারি বাহিনী খাদ্য, ওষুধ ও জ্বালানি আটকে দিয়েছে’—এই অভিযোগ সরকার অস্বীকার করেছে। দ্য এক্সপ্রেস ট্রিবিউনের ২৬ জুনের প্রতিবেদনে পাকিস্তানের তথ্য মন্ত্রণালয় ও আজাদ কাশ্মীর সরকারের বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়, পুলিশ খাদ্য, ওষুধ ও জ্বালানি পরিবহন বন্ধ করেছে—এমন দাবি ‘তথ্যগতভাবে ভুল’। সরকারের দাবি, বড় প্রবেশপথগুলো খোলা ছিল; বরং জেএএসি-সংশ্লিষ্ট কর্মীরা কিছু স্থানে বাধা সৃষ্টি করে পণ্যবাহী যান আটকানোর চেষ্টা করেছে।
সব মিলিয়ে পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীরের বর্তমান সংকট শুধু রাজনৈতিক দাবিদাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি সাধারণ মানুষের খাবার, চিকিৎসা, যাতায়াত, আয়-রোজগার ও নিরাপত্তার সংকটে রূপ নিয়েছে। বাজার আংশিক খোলার ঘোষণা এলেও স্থানীয়ভাবে আস্থা ফিরতে সময় লাগবে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে এখন সবচেয়ে জরুরি হলো সহিংসতা বন্ধ, সরবরাহ লাইন নিরাপদ রাখা এবং আন্দোলনকারী ও সরকারের মধ্যে বিশ্বাসযোগ্য আলোচনার পথ তৈরি করা।