
বিদেশি নাগরিকদের জন্য ভিসা ফি উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে জাপান সরকার। প্রায় পাঁচ দশক পর প্রথমবারের মতো ভিসা ফি পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে, যেখানে কিছু ক্ষেত্রে ব্যয় পাঁচ গুণ পর্যন্ত বাড়ছে।
মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানানো হয়, আগামী ১ জুলাই থেকে নতুন ফি কাঠামো কার্যকর হবে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, সিঙ্গেল এন্ট্রি ভিসার ফি বর্তমান ৩ হাজার ইয়েন থেকে বাড়িয়ে ১৫ হাজার ইয়েনে উন্নীত করা হয়েছে।
জাপান সরকারের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৮ সালের পর এই প্রথম ভিসা ফি বাড়ানো হচ্ছে। মূল্যস্ফীতি, প্রশাসনিক ব্যয় বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারের ওঠানামার কারণে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে টোকিও।
সরকারের ভাষ্য, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও ইয়েনের বিনিময়মূল্যের পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রাখতেই নতুন ফি নির্ধারণ করা হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইয়েনের অবমূল্যায়ন ঠেকাতে নানা পদক্ষেপ নেওয়া হলেও মুদ্রাটি এখনও কয়েক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ের কাছাকাছি অবস্থান করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে জাপানে পর্যটকের সংখ্যা ব্যাপকভাবে বেড়ে যাওয়ায় দেশটির অবকাঠামো ও জনসেবার ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে। ফলে প্রশাসনিক ব্যয় মেটাতেও সরকার নতুন রাজস্ব উৎসের দিকে ঝুঁকছে।
জেমস কুক ইউনিভার্সিটির হসপিটালিটি অ্যান্ড ট্যুরিজম ম্যানেজমেন্ট বিভাগের সিনিয়র লেকচারার জিলমিয়াহ কাম্বলে বলেন, দীর্ঘদিন আগের অর্থনৈতিক বাস্তবতায় নির্ধারিত ভিসা ফি বর্তমান পরিস্থিতিতে আর কার্যকর ছিল না।
তার মতে, ভিসা ফি বৃদ্ধি সরাসরি পর্যটক সংখ্যা কমানোর উদ্দেশ্যে নয়; বরং ক্রমবর্ধমান দর্শনার্থীদের ব্যবস্থাপনায় সরকারের প্রশাসনিক ও পরিচালন ব্যয়ের একটি অংশ বহনে এটি সহায়ক হবে।
এদিকে, জাপানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তোশিমিতসু মোতেগি বলেছেন, ভিসা ফি বৃদ্ধি দেশটির পর্যটন খাতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে সরকার মনে করছে না।
ভিসা ফি বৃদ্ধির পাশাপাশি জাপান ত্যাগকারী ভ্রমণকারীদের জন্য প্রযোজ্য ডিপার্চার ট্যাক্সও ১ হাজার ইয়েন থেকে বাড়িয়ে ৩ হাজার ইয়েন করা হচ্ছে।
ডেলয়েট তোহমাতসু গ্রুপের প্রধান অর্থনীতিবিদ ও পার্টনার ইউকি মাসুজিমা বলেন, জাপান থেকে যাত্রা করা যাত্রীদের মধ্যে বিদেশি পর্যটকদের অংশ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটেই এই পরিবর্তন আনা হয়েছে।
তার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে জাপান ত্যাগকারী যাত্রীদের প্রায় ৭৪ শতাংশই বিদেশি পর্যটক। অথচ ২০১৩ সালে ‘আবেনোমিকস’ নীতির আগে এ হার ছিল মাত্র ২০ থেকে ৩০ শতাংশের মধ্যে।
মাসুজিমা বলেন, বিদেশি পর্যটকেরা জাপানে কেনাকাটার ক্ষেত্রে সেলস ট্যাক্স ফেরত পাওয়ার সুবিধা ভোগ করেন। ফলে সংশ্লিষ্ট কিছু ব্যয় পুনরুদ্ধারে ভিসা ফি ও ডিপার্চার ট্যাক্স বৃদ্ধি সহায়ক ভূমিকা রাখবে।
তবে কর ও ফি বাড়লেও এতে পর্যটকদের আগ্রহ কমে যাবে বলে মনে করেন না তিনি। তার মতে, জাপানে আগত অনেক পর্যটক দ্বিতীয় বা তৃতীয়বারের মতো দেশটি ভ্রমণ করেন, যা জাপানের দীর্ঘমেয়াদি পর্যটন আকর্ষণের প্রমাণ।
ডেন্টসুর পরিচালিত ‘জাপান ব্র্যান্ড সার্ভে ২০২৫’-এর তথ্যও একই ইঙ্গিত দিচ্ছে। জরিপে অংশ নেওয়া ১২ হাজার ৪০০ জনের মধ্যে ৫২ দশমিক ৭ শতাংশ জানিয়েছেন, তারা ভবিষ্যতে আবারও জাপান ভ্রমণ করতে চান। জরিপে অন্তর্ভুক্ত ২০টি পর্যটন বাজারের মধ্যে জাপান শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, শুধু দুর্বল ইয়েন নয়, বরং জাপানের খাবার, সংস্কৃতি এবং পণ্যের বৈচিত্র্যই দেশটিকে পর্যটকদের কাছে আরও আকর্ষণীয় করে তুলছে।
এদিকে, চলতি বছরের মে মাসে জাপানের উচ্চকক্ষ স্থায়ী আবাসনের আবেদন ফি বৃদ্ধির একটি আইনও পাস করেছে। নতুন আইনে পার্মানেন্ট রেসিডেন্সির আবেদন ফি সর্বোচ্চ ১০ হাজার ইয়েন থেকে বাড়িয়ে ৩ লাখ ইয়েন এবং রেসিডেন্সি স্ট্যাটাস পরিবর্তনের ফি ১০ হাজার ইয়েন থেকে বাড়িয়ে সর্বোচ্চ ১ লাখ ইয়েন করার বিধান রাখা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব পরিবর্তনের মূল লক্ষ্য হচ্ছে অভিবাসন ব্যবস্থাপনার ক্রমবর্ধমান প্রশাসনিক ব্যয় সামাল দেওয়া এবং একই সঙ্গে আরও দক্ষ ও যোগ্য মানবসম্পদকে জাপানে আকৃষ্ট করা।