
একটি দেশের বিমানবাহিনী পুরোনো, অর্থনীতি দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞায় ক্ষতিগ্রস্ত, সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব বারবার হামলার লক্ষ্যবস্তু এবং আকাশসীমায় প্রতিপক্ষের সুস্পষ্ট আধিপত্য—এমন পরিস্থিতিতে অনেকের কাছে স্বাভাবিক ধারণা ছিল, ইরানের পতন হয়তো কেবল সময়ের ব্যাপার।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এমন বিশ্লেষণের অভাব ছিল না, যেখানে বলা হচ্ছিল, দীর্ঘমেয়াদি সামরিক চাপের মুখে ইরানের প্রতিরক্ষা কাঠামো ভেঙে পড়বে, অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা বাড়বে এবং শেষ পর্যন্ত তেহরানকে অনুকূল নয় এমন সমঝোতায় যেতে বাধ্য হতে হবে।
কিন্তু বাস্তবতা সেই পূর্বাভাসকে পুরোপুরি সমর্থন করেনি।
নিঃসন্দেহে ইরান বড় ধরনের ক্ষতির মুখোমুখি হয়েছে। সামরিক স্থাপনা, অবকাঠামো এবং অর্থনীতিতে চাপ তৈরি হয়েছে। জাতীয় নিরাপত্তা কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের হারিয়েছে দেশটি এবং পারমাণবিক কর্মসূচিও আন্তর্জাতিক নজরদারির নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করতে পারে। তবুও যুদ্ধের শেষ পর্যন্ত ইরান রাষ্ট্র হিসেবে ভেঙে পড়েনি কিংবা আত্মসমর্পণের অবস্থানে পৌঁছায়নি।
বরং যুদ্ধবিরতি, নিষেধাজ্ঞা শিথিলকরণ, জ্বালানি বাজার, হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার মতো বিভিন্ন প্রশ্নে আলোচনার টেবিলে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে তেহরান।
বিশ্লেষকদের একটি বড় ভুল ছিল যুদ্ধকে শুধুমাত্র সামরিক সক্ষমতার দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করা। উন্নত যুদ্ধবিমান, স্যাটেলাইট নজরদারি, সাইবার সক্ষমতা এবং আধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার সঙ্গে তুলনা করলে ইরান অনেক ক্ষেত্রেই পিছিয়ে। কিন্তু আধুনিক সংঘাত কেবল অস্ত্রের সংখ্যার ওপর নির্ভর করে না; রাষ্ট্রের সহনশীলতা, অর্থনৈতিক স্থিতি, জনগণের মনস্তত্ত্ব এবং দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সংকল্পও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
দ্বিতীয় ভুল ছিল সামরিক ক্ষয়ক্ষতিকে সরাসরি রাজনৈতিক পরাজয়ের সমার্থক হিসেবে দেখা। ইতিহাস বলছে, কোনো দেশের অবকাঠামো ধ্বংস বা সামরিক ক্ষতি হলেও রাজনৈতিক কাঠামো সবসময় ভেঙে পড়ে না। ইরানের ক্ষেত্রেও সেটিই দেখা গেছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল ইরানের যুদ্ধকৌশল। দেশটি সরাসরি প্রচলিত সামরিক সংঘর্ষের পরিবর্তে আঞ্চলিক প্রভাব, জ্বালানি বাজার, সমুদ্রপথ এবং মিত্র গোষ্ঠীগুলোর উপস্থিতিকে কৌশলগত সম্পদ হিসেবে ব্যবহার করেছে।
বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব এই সংঘাতে নতুনভাবে আলোচনায় আসে। বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথে উত্তেজনা তৈরি হলেই আন্তর্জাতিক তেলবাজারে প্রভাব পড়ে। ফলে সামরিক সংঘাতের পাশাপাশি অর্থনৈতিক চাপও একটি কার্যকর কৌশলগত উপাদানে পরিণত হয়।
একইভাবে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে ইরানের প্রভাব ও মিত্র গোষ্ঠীগুলোর উপস্থিতি সংঘাতকে একটি বিস্তৃত আঞ্চলিক মাত্রা দিয়েছে। এর ফলে যেকোনো সামরিক সিদ্ধান্তকে শুধু যুদ্ধক্ষেত্রের নয়, বরং বৃহত্তর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিতে হয়েছে।
অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি নিয়েও অনেকের ধারণা ছিল, অর্থনৈতিক চাপ ও রাজনৈতিক অসন্তোষ বিদেশি হামলার মুখে রাষ্ট্রীয় সংহতিকে দুর্বল করে দেবে। তবে বাস্তবতায় দেখা গেছে, বহিরাগত হুমকির মুখে জাতীয়তাবোধ অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিভাজনের চেয়েও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে।
এই সংঘাত যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও নতুন কিছু প্রশ্ন সামনে এনেছে। উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর যুদ্ধ পরিচালনা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। আধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, বিমান অভিযান এবং দীর্ঘমেয়াদি মোতায়েনের অর্থনৈতিক চাপ ক্রমেই বাড়ছে।
অন্যদিকে তুলনামূলক কম খরচের ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র বা অসম যুদ্ধকৌশলের মোকাবিলায় অনেক বেশি ব্যয়বহুল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করতে হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক ভারসাম্যের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই বাস্তবতা আধুনিক যুদ্ধের একটি নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে—সামরিক শক্তির পাশাপাশি অর্থনৈতিক সহনশীলতাও এখন সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সবশেষে এই সংঘাত একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা সামনে এনেছে: সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব এবং রাজনৈতিক বিজয় সবসময় একই বিষয় নয়।
একটি রাষ্ট্রকে কেবল সামরিক আঘাতের মাধ্যমে নতিস্বীকার করানো কঠিন, যদি তার রাজনৈতিক নেতৃত্ব, জাতীয় মনোবল, ভৌগোলিক অবস্থান এবং কৌশলগত সক্ষমতা টিকে থাকে।
ইরান হয়তো সামরিক অর্থে বিজয় দাবি করতে পারবে না, কিন্তু এটাও স্পষ্ট যে দেশটি দ্রুত পরাজিত হয়নি। বরং এই সংঘাত দেখিয়েছে, সামরিকভাবে দুর্বল হওয়া এবং কৌশলগতভাবে পরাজিত হওয়া এক বিষয় নয়।
আধুনিক যুদ্ধের বাস্তবতায় শেষ পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে আরেকটি প্রশ্ন—কে কাকে সম্পূর্ণভাবে পরাস্ত করল, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো, কে নিজের লক্ষ্য অর্জন করতে পারল এবং যুদ্ধ শেষে কার হাতে রইল আলোচনার সবচেয়ে শক্তিশালী তাস।