
জ্বালানির ঊর্ধ্বমুখী দাম, মূল্যস্ফীতির চাপ এবং প্রবাসী আয়ের প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার আশঙ্কায় পাকিস্তানের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়েছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। একই সঙ্গে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার বেশ কয়েকটি দেশের প্রবৃদ্ধি নিয়েও সতর্কতা জানিয়েছে সংস্থাটি।
এডিবির জুলাই মাসের ‘এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট আউটলুক’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাকিস্তানের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৭ শতাংশ হতে পারে। গত এপ্রিলের পূর্বাভাসে এ হার ৪ দশমিক ৫ শতাংশ ধরা হয়েছিল। অর্থাৎ মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে দেশটির সম্ভাব্য প্রবৃদ্ধি ০ দশমিক ৮ শতাংশ পয়েন্ট কমানো হয়েছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পাকিস্তানের অর্থনীতি প্রাথমিক হিসাবে ৩ দশমিক ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। শিল্প ও সেবা খাতের উন্নতি এবং কৃষি খাতের সীমিত অগ্রগতি ইতিবাচক ভূমিকা রাখলেও সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে জ্বালানির উচ্চ মূল্য, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং প্রবাসী আয়ের প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার সম্ভাবনা।
মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়তে পারে
প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি পাকিস্তানের মূল্যস্ফীতির পূর্বাভাসও বাড়িয়েছে এডিবি। সংস্থাটির মতে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশটির মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ২ শতাংশ এবং ২০২৬-২৭ অর্থবছরে তা বেড়ে ৮ দশমিক ৩ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।
এর আগে এপ্রিলের পূর্বাভাসে মূল্যস্ফীতি যথাক্রমে ৬ দশমিক ৪ এবং ৭ দশমিক ২ শতাংশ হবে বলে ধারণা দেওয়া হয়েছিল।
খাদ্য ও জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের প্রভাব মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়িয়ে তুলছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে পাকিস্তান সরকার চলতি অর্থবছরের জন্য ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি এবং ৮ দশমিক ২ শতাংশ মূল্যস্ফীতির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) অবশ্য দেশটির প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৫ শতাংশ হবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে।
দক্ষিণ এশিয়াজুড়েই শঙ্কা
পাকিস্তানের পাশাপাশি উন্নয়নশীল এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সামগ্রিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসও কমিয়েছে এডিবি। সংস্থাটির হিসাবে, ২০২৬ সালে এ অঞ্চলের প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৯ শতাংশ হতে পারে, যা ২০২৫ সালে ছিল ৫ দশমিক ৫ শতাংশ।
দক্ষিণ এশিয়ার বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কাসহ কয়েকটি দেশের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসও নিম্নমুখী সংশোধন করা হয়েছে। উচ্চ জ্বালানি মূল্য, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তাকে এর প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে এডিবি।
বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধিও সংশোধিত নিম্নমুখী পূর্বাভাসের তালিকায় রয়েছে, যা দেশের নীতিনির্ধারকদের জন্য সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ভারতের ২০২৬ সালের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে ৬ দশমিক ৬ শতাংশ করা হলেও ২০২৭ সালের জন্য তা ৭ দশমিক ৩ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। চীনের প্রবৃদ্ধি ২০২৬ সালে ৪ দশমিক ৬ শতাংশ এবং ২০২৭ সালে ৪ দশমিক ৫ শতাংশ হতে পারে বলে ধারণা করছে এডিবি।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাব
এডিবির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাব শুধু জ্বালানির বাজারেই সীমাবদ্ধ নয়; এর প্রভাব পড়ছে সার, কাঁচামাল ও আন্তর্জাতিক পরিবহন ব্যয়ের ওপরও। ফলে কৃষি উৎপাদন, খাদ্যনিরাপত্তা এবং সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি হচ্ছে।
সংস্থাটির প্রধান অর্থনীতিবিদ আলবার্ট পার্ক বলেন, উন্নয়নশীল এশিয়ার অর্থনীতি এখনও তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রয়েছে। তবে দীর্ঘস্থায়ী ভূরাজনৈতিক সংঘাতের কারণে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর জন্য প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
এডিবি আরও সতর্ক করেছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত তীব্র হলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ আরও সংকুচিত হতে পারে। একই সঙ্গে ঋণের সুদের হার, সরকারি ঋণ গ্রহণের ব্যয় এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে শুল্ক ও নীতিগত অনিশ্চয়তা বাড়ার ঝুঁকিও রয়েছে।
অর্থনীতির এই পরিবর্তনের প্রভাব শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের জীবনেই সবচেয়ে বেশি পড়ে। প্রবৃদ্ধি কমলে কর্মসংস্থানের সুযোগ সংকুচিত হয়, আর মূল্যস্ফীতি বাড়লে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে।
সূত্র: পাকিস্তানের দৈনিক ডন ও এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট আউটলুক।