
হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে ইরানের বর্তমান সামরিক কৌশলের ভিত্তি প্রায় দেড় দশক আগে সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলী খামেনির নির্দেশনায় তৈরি হয়েছিল বলে দাবি করেছেন দেশটির জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তা মেজর জেনারেল ইয়াহইয়া রহিম সাফাভি।
ইরানের আধা সরকারি সংবাদমাধ্যম তাসনিম নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সাফাভি বলেন, জাতীয় প্রতিরক্ষা কৌশল নির্ধারণে খামেনি অসাধারণ দূরদর্শিতা দেখিয়েছেন এবং সামরিক নীতিমালা প্রণয়নে তার ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, ২০১১ সালে খামেনি তাকে এক মাসের মধ্যে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করার জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ সামরিক পরিকল্পনা তৈরির নির্দেশ দেন। পরে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে সমন্বয় করে তিনি ১৫ পৃষ্ঠার একটি কৌশলগত পরিকল্পনা প্রস্তুত করেন।
সাফাভি জানান, ওই পরিকল্পনা শুধু হরমুজ প্রণালিকে ঘিরেই সীমাবদ্ধ ছিল না; এতে পারস্য উপসাগর, ওমান সাগর, লোহিত সাগর এবং ভূমধ্যসাগরে সম্ভাব্য সামরিক অভিযানের বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল।
তিনি দাবি করেন, পরিকল্পনাটি পরবর্তীতে খামেনি ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর জেনারেল স্টাফের কাছে বাস্তবায়নের জন্য পাঠান। বর্তমানে যেসব সামরিক পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে, সেগুলোর ভিত্তি সেই প্রায় ১৫ বছর আগে প্রণীত কৌশলেই নিহিত।
ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও খামেনির বিশেষ নির্দেশনার কথা তুলে ধরেন সাফাভি। তিনি বলেন, ১৯৯৭ সালে আইআরজিসির কমান্ডারের দায়িত্ব নেওয়ার পর খামেনি তাকে দেশের ক্ষেপণাস্ত্র ভান্ডার দ্রুত সম্প্রসারণের নির্দেশ দেন। তার দাবি, সে সময় ইরানের কাছে প্রায় দুই হাজার ক্ষেপণাস্ত্র ছিল। তবে খামেনি সেটিকে পর্যাপ্ত মনে করেননি। তার নির্দেশ ছিল, এমন সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে, যাতে অন্তত তিন মাস টানা আক্রমণাত্মক যুদ্ধ পরিচালনা সম্ভব হয়।
সাফাভির বক্তব্য অনুযায়ী, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা শুরু হওয়ার পরপরই ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়। পরে ৭ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দিলেও ইরানি জাহাজ ও বন্দরগুলোর ওপর নৌ অবরোধ বহাল রাখার কথা জানায়। এর পর থেকেই হরমুজ প্রণালিতে আরও কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে তেহরান।
এরপর ১৭ জুন পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হলে হরমুজ প্রণালির পরিচালনার দায়িত্ব পুনরায় গ্রহণ করে ইরান। ওই সমঝোতা অনুযায়ী, জাহাজ চলাচলের জন্য একটি নির্দিষ্ট নৌপথ নির্ধারণ করে তেহরান এবং অন্য কোনো পথ ব্যবহার না করার জন্য সতর্কবার্তা দেয়।
তবে ইরানের অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্র নির্ধারিত রুটের বাইরে একটি বিকল্প করিডোর দিয়ে জাহাজ চলাচলের ব্যবস্থা করার চেষ্টা করছে। তেহরানের দাবি, ওয়াশিংটন আঞ্চলিক নৌ চলাচলে হস্তক্ষেপ বন্ধ না করা পর্যন্ত ওই করিডোর বন্ধই থাকবে।
অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার হুমকি দিয়ে বলেছেন, এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ‘অনেক অর্থ আয় করবে’। জবাবে ইরান জানিয়েছে, ‘পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত’ হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকবে এবং আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী এর প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ইরানের হাতেই থাকবে।