
পারস্য উপসাগর ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার যুদ্ধাবস্থা এবার এক রক্তক্ষয়ী ও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। ইরানের দক্ষিণাঞ্চলে মার্কিন সামরিক বাহিনীর সাম্প্রতিক এক তীব্র বিমান ও নৌ হামলায় নারী ও শিশুসহ কমপক্ষে ৩৫ জন সাধারণ নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন। এই নজিরবিহীন আগ্রাসনে গুরুতর আহত হয়েছেন আরও তিন শতাধিক মানুষ। ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষয়ক্ষতির এই লোমহর্ষক তথ্য নিশ্চিত করেছে।
সবচেয়ে বেশি বিপর্যস্ত হরমোজগান, সিস্তান-বেলুচিস্তান ও খুজেস্তান
ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র হোসেন কেরমানপুর মার্কিন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে হতাহত ও ধ্বংসযজ্ঞের সর্বশেষ বিবরণ তুলে ধরেন। তিনি জানান, মার্কিন বাহিনীর সাম্প্রতিক এই নির্বিচার হামলায় মূলত ইরানের তিনটি প্রদেশ—হরমোজগান, সিস্তান ও বেলুচিস্তান এবং খুজেস্তান সবচেয়ে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ও বিপর্যস্ত হয়েছে।
এর বাইরেও গত বুধবার সকালে দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় বুশেহর শহরের তিনটি সুনির্দিষ্ট স্থানে নতুন করে হামলা চালায় মার্কিন বাহিনী। তবে সেখানে নতুন করে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি বলে বুশেহর প্রদেশের গভর্নর নিশ্চিত করেছেন।
ট্রাম্পের আরও বড় বিধ্বংসী হামলার হুঁশিয়ারি
চলমান এই চরম সামরিক উত্তেজনা ও পারস্য উপসাগরের সংঘাত প্রসঙ্গে গত মঙ্গলবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক কড়া বিবৃতি দিয়েছেন। তেহরানকে দ্রুত আলোচনার টেবিলে বসার আলটিমেটাম দিয়ে তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন যে, ইরানের ওপর ওয়াশিংটনের এই আক্রমণ অব্যাহত থাকবে এবং আগামী দিনগুলোতে এর ভয়াবহতা আরও কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেওয়া হবে। তিনি সতর্ক করে বলেন, ইরান যদি অবিলম্বে সমঝোতায় না আসে, তবে আগামী সপ্তাহ থেকে দেশটির সমস্ত প্রধান বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র এবং অতিগুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ সেতুগুলোকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে বড় ধরনের বিধ্বংসী হামলা শুরু করা হবে।
হরমুজ প্রণালীর পাল্টা জবাব ও মার্কিন নৌ অবরোধ
মার্কিন সামরিক প্রশাসনের দাবি, গত রোববার ভোর থেকে ইরানের বিভিন্ন শহর ও কৌশলগত দ্বীপে তারা এই দৈনিক ধারাবাহিক হামলা পরিচালনা করছে। মূলত হরমুজ প্রণালীতে চলাচলকারী আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর তেহরান যে আক্রমণ চালিয়েছিল, এটি তারই পাল্টা জবাব। এই ধারাবাহিকতায় গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) ইরানের ওপর পুনরায় সম্পূর্ণ নৌ অবরোধ (ব্লকেড) আরোপের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়।
আমেরিকার এই কঠোর অবরোধের জবাবে ইরানও আরব দেশগুলোতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করে পাল্টা ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। এর ফলে বেশ কিছু আরব দেশ ইরানের বিরুদ্ধে তাদের ভূখণ্ডে বেসামরিক নাগরিক হতাহত এবং রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো ধ্বংসের পাল্টা অভিযোগ তুলেছে।
শান্তি চুক্তি ভেস্তে যাওয়ার মুখে, জাতিসংঘের দ্বারস্থ ইরান
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার এই যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি এমন এক সময়ে চরম আকার ধারণ করল, যখন বন্ধুভাবাপন্ন প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় দুই বৈরী দেশের সংঘাত নিরসন ও একটি স্থায়ী শান্তি চুক্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে একটি বিশেষ সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছিল। তবে আমেরিকা এই শান্তি সমঝোতার শর্তগুলো সরাসরি লঙ্ঘন করেছে—এমন তীব্র নিন্দা জানিয়ে এবং মার্কিন প্রশাসনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ তুলে জাতিসংঘের কাছে একটি বিশেষ নালিশি চিঠি পাঠিয়েছে ইরান।