
অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় রক্তপাতের যেন কোনো শেষ নেই। তথাকথিত ‘যুদ্ধবিরতি’ ঘোষণার ৯ মাস পেরিয়ে গেলেও প্রতিনিয়ত আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে উপত্যকাটিতে রক্তক্ষয়ী তাণ্ডব চালাচ্ছে তেল আবিব। এবার গাজাজুড়ে ইসরায়েলি বাহিনীর চালানো নতুন দফার বিমান ও ড্রোন হামলায় অন্তত ১৪ জন ফিলিস্তিনি প্রাণ হারিয়েছেন, যার মধ্যে একটি জানাজার নামাজ ও দাফন প্রক্রিয়া চলাকালীন সরাসরি ড্রোন হামলার শিকার হয়ে মারা গেছেন অর্ধেকেরও বেশি মানুষ।
গাজার সিভিল ডিফেন্স এজেন্সি এবং আল-আওদা হাসপাতালের দেওয়া তথ্যমতে, মধ্য গাজার নুসেইরাত শরণার্থী শিবিরের অন্তর্গত আল-বালাতা বাজার এলাকায় ফিলিস্তিনিদের একটি জমায়েত লক্ষ্য করে ইসরায়েলি ড্রোন থেকে বোমা ফেলা হয়। এতে ঘটনাস্থলেই আটজন নিহত এবং অন্তত ২০ জন গুরুতর আহত হন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, নুসেইরাতেই পূর্বে ইসরায়েলি আগ্রাসনে নিহত এক ফিলিস্তিনির জানাজা শেষে যখন মরদেহের খাটিয়া নিয়ে বের হওয়া হচ্ছিল, ঠিক তখনই এই নৃশংস হামলা চালানো হয়। আহমেদ ইয়াসিন মসজিদের বাইরে অপেক্ষমাণ শোকাহত জনতার ওপর ড্রোন থেকে সরাসরি হামলা চালালে এই ব্যাপক হতাহতের ঘটনা ঘটে।
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী এই হামলার দায় স্বীকার করেছে। ফরাসি সংবাদ সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, ইসরায়েলি সেনাবাহিনী মধ্য গাজায় একটি 'সন্ত্রাসী সেল' লক্ষ্য করে এই অভিযান চালানোর দাবি করেছে। তবে একই সঙ্গে তারা বেসামরিক নাগরিকদের হতাহতের খবরের বিষয়ে অবগত আছে এবং বিষয়টি খতিয়ে দেখছে বলে উল্লেখ করেছে। ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ আন্দোলন হামাস এই বর্বরোচিত হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেছে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও মধ্যস্থতাকারীদের চোখের সামনে যুদ্ধবিরতি চুক্তি পদ্ধতিগতভাবে লঙ্ঘন করে নিরীহ নাগরিকদের হত্যা ও আতঙ্কিত করে চলেছে আগ্রাসী ইসরাইলি সরকার।
গত শুক্রবারের (১৭ জুলাই) এই জানাজায় হামলার পাশাপাশি গাজার অন্য প্রান্তগুলোতেও বেশ কয়েকটি প্রাণঘাতী হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। উত্তর গাজার বেইত লাহিয়া শহরের আবু তামাম স্কুলের সন্নিকটে ড্রোন থেকে ফেলা বোমার আঘাতে ৫২ বছর বয়সি এক নারী নিহত হন। এছাড়া মধ্য গাজার আজ-জাওয়ায়দা শহরে বেসামরিক নাগরিকদের ওপর হামলায় একজন এবং নুসেইরাত শিবিরের পশ্চিমে আল-সাওয়ারহা এলাকায় বাস্তুচ্যুত মানুষের একটি আশ্রয়শিবিরে ইসরায়েলি গোলার আঘাতে আরও একজন প্রাণ হারান।
পৃথক আরেকটি ঘটনায়, গাজা সিটির একটি আবাসিক অ্যাপার্টমেন্টে ড্রোন হামলায় এক ফিলিস্তিনি নিহত এবং শিশুসহ বেশ কয়েকজন আহত হন। পাশাপাশি খান ইউনিসের দক্ষিণ-পশ্চিমে ইসরায়েলি গুলিতে আহত আরেক নারী চিকিৎসাধীন অবস্থায় হাসপাতালে মারা গেছেন।
গাজার সার্বিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা এসিএলইডি জানিয়েছে, গত অক্টোবর থেকে নামমাত্র যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও মে মাস থেকে গাজায় ইসরায়েলি হামলার তীব্রতা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। গত মাসে ইসরায়েল ৪০টিরও বেশি বিমান হামলা চালিয়েছে, যা যুদ্ধবিরতি শুরু হওয়ার পর এক মাসে সর্বোচ্চ।
এদিকে ইসরায়েলি সংবাদপত্র ‘হারেৎজ’ তাদের এক প্রতিবেদনে উদ্বেগজনক তথ্য প্রকাশ করে জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর থেকে ইসরায়েল গাজায় নিয়মিতভাবে শিশুদের নিশানা করছে। গত ৯ মাসে অন্তত ২৭৪ জন ফিলিস্তিনি শিশু নিহত হয়েছে, যার অর্থ দাঁড়ায় গড়ে প্রতিদিন একটি করে শিশুকে হত্যা করেছে ইসরায়েলি বাহিনী। গাজাজুড়ে ইসরায়েলি ড্রোনের অবিরাম যান্ত্রিক শব্দ এবং একের পর এক আবাসন ধ্বংসের এই ধারা উপত্যকার সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সমস্ত আশা ধূলিসাৎ করে দিচ্ছে।