
টানা বৃষ্টির জলাবদ্ধতা ও কর্মকর্তা হেনস্তার জেরে তৈরি হওয়া শ্রমিক অসন্তোষের জেরে শেষ পর্যন্ত বন্ধ হয়ে গেছে গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার তেলিচালা এলাকায় অবস্থিত ‘বে-ফুটওয়্যার লিমিটেড’ নামের একটি জুতা উৎপাদনকারী কারখানা। একই সঙ্গে কোনো আগাম বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই ৩৩০ জন শ্রমিককে চাকরিচ্যুত করে কারখানার মূল ফটকে নামের তালিকা ঝুলিয়ে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
আজ শনিবার সকালে কারখানা প্রাঙ্গণে গিয়ে এমন চিত্রই দেখা গেছে।
স্থানীয় ও কারখানা সূত্রে জানা যায়, সাম্প্রতিক টানা বর্ষণে সৃষ্ট জলাবদ্ধতার কারণে অনেক শ্রমিকই সময়মতো কারখানায় এসে কাজে যোগ দিতে পারছিলেন না। এই হাজিরাসংক্রান্ত জটিলতা নিয়ে গত ১২ জুলাই শ্রমিকদের সঙ্গে কারখানা কর্তৃপক্ষের তীব্র বাদানুবাদ হয়। ওই দিন কারখানার অভ্যন্তরে কর্মবিরতি পালন করার সময় উৎপাদন কর্মকর্তা র্যালি বস শ্রমিকদের পুনরায় কাজে ফেরার নির্দেশ দিলে উভয় পক্ষের মধ্যে বিতর্ক আরও চরম আকার ধারণ করে। এ সময় শ্রমিকদের বিরুদ্ধে ওই কর্মকর্তাকে লাঞ্ছিত করার অভিযোগ তোলে কর্তৃপক্ষ। এই ঘটনার জেরে জড়িত থাকার অভিযোগে গত ১৩ ও ১৪ জুলাই বেশ কিছু শ্রমিকের পরিচয়পত্র (আইডি কার্ড) রেখে তাদের কারখানা থেকে বের করে দেওয়া হয়।
এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে শ্রমিকরা দফায় দফায় বিক্ষোভ শুরু করলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। এরপর গত ১৫ জুলাই সকালে শ্রমিকরা যথারীতি কাজে যোগ দিতে এলে কারখানাটি অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণার নোটিশ দেখতে পান। বিরতি দিয়ে আজ শনিবার সকালে কারখানাটি পুনরায় চালুর দাবিতে আবারও সেখানে জড়ো হন শ্রমিকরা। তবে এবার তারা কারখানার দেওয়ালে ৩৩০ জন শ্রমিকের চাকরিচ্যুতির এক বিশাল তালিকা দেখতে পান। অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে এবং নিরাপত্তা জোরদারে কারখানার সামনে অতিরিক্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েন করেছে কর্তৃপক্ষ।
শ্রমিকদের দাবি ও ক্ষোভ
চাকরি হারানো শ্রমিক রত্না বেগম ও খালেদা আক্তার জানান, কয়েক দিন আগের ভারী বর্ষণে তাদের ঘরবাড়ি পানিতে ডুবে গিয়েছিল। সেই প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে কারখানায় পৌঁছাতে কিছুটা দেরি হয়েছিল। কিন্তু কর্তৃপক্ষ মানবিক দিক বিবেচনা না করে উল্টো অনেক শ্রমিকের আইডি কার্ড কেড়ে নেয়। পরবর্তীতে ১২ জুলাই কর্মবিরতি চলাকালীন এক চীনা উৎপাদন কর্মকর্তার সঙ্গে শ্রমিকদের বাগ্বিতণ্ডা হয়। ওই কর্মকর্তা ঘটনার ভিডিও ধারণ করতে গেলে ক্ষুব্ধ শ্রমিকরা তার মোবাইল ফোনটি কেড়ে নেন। এর পরদিন থেকেই কারখানা বন্ধ করে দেওয়া হয়।
হতাশা ব্যক্ত করে তারা বলেন:
‘আমাদের কী অপরাধ? যারা চীনা কর্মকর্তাকে হেনস্তা করেছে, তাদের ভিডিও ফুটেজ দেখে ছাঁটাই করুক। আমাদের কেন ছাঁটাই করবে। আমরা আমাদের চাকরি পূর্ণ বহাল চাই।’
কর্তৃপক্ষ ও পুলিশের বক্তব্য
কারখানার বর্তমান পরিস্থিতি ও শ্রমিক ছাঁটাইয়ের বিষয়ে জানতে চাইলে বে-ফুটওয়্যার লিমিটেডের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) কাজী রোমান রহমান বিস্তারিত মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান। তিনি বলেন:
‘শ্রমিক ও কারখানার বিষয়ে এই মুহূর্তে কথা বলার অনুমতি নেই।’
এটুকু বলেই তিনি মুঠোফোনের সংযোগ কেটে দেন।
অন্যদিকে, কালিয়াকৈর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শহিদুল ইসলাম ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন:
‘কারখানায় শ্রমিক অসন্তোষে কিছু শ্রমিক ছাঁটাই করেছেন কর্তৃপক্ষ। কারখানায় নিরাপত্তার স্বার্থে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।’