
জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সরকার ব্যর্থ হলে গণআন্দোলন থেকে গণঅভ্যুত্থান পর্যন্ত কর্মসূচি নিতে বাধ্য হওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, এখনো হরতাল বা অবরোধের মতো কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়নি, তবে প্রয়োজন হলে যে কোনো সময় এমন কর্মসূচি দেওয়া হতে পারে।
শনিবার (১৮ জুলাই) বিকেলে বরিশাল নগরীর ভাটারখাল এলাকার কেন্দ্রীয় ঈদগাহ মাঠে ১১ দলীয় ঐক্যের বিভাগীয় সমাবেশে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
সমাবেশে প্রধান অতিথি ছিলেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন কেন্দ্রীয় জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও বরিশাল অঞ্চলের পরিচালক অ্যাডভোকেট মুয়ায্যম হোসাইন হেলাল।
নাহিদ ইসলাম বলেন, তারা শুরুতে কঠোর রাজনৈতিক কর্মসূচির পক্ষে ছিলেন না। তবে সরকারের অবস্থান এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পদক্ষেপ পরিস্থিতিকে ভিন্ন দিকে নিয়ে যাচ্ছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। তার ভাষ্য, প্রধানমন্ত্রী গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারণা চালালেও, নির্বাচনের পর ৭০ শতাংশ মানুষের সংস্কারপন্থী রায় সত্ত্বেও জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করছেন না। অথচ প্রকাশ্যে এখনো তিনি সনদটি অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়নের কথা বলে যাচ্ছেন।
তিনি আরও বলেন, জনগণের ভোটে ক্ষমতায় আসা মানে ইচ্ছামতো সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার নয়। জনগণের সঙ্গে প্রতারণা বা ছলচাতুরী করার সুযোগও নয়। বিএনপির সমালোচনা করে তিনি বলেন, দলটি গত ১৬ বছর গণতন্ত্রের কথা বললেও ৫ আগস্টের পর থেকে তারা গণতন্ত্রবিরোধী অবস্থান নিয়েছে। তার দাবি, বিএনপির মূল লক্ষ্য কখনোই গণতন্ত্র ছিল না; তারা ক্ষমতা অর্জনের উদ্দেশ্যেই গণঅভ্যুত্থানে অংশ নিয়েছিল।
বিরোধী দলীয় চিফ হুইপের অভিযোগ, নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসার পর বিএনপি এখন আর পরিবর্তন, সংস্কার, ৩১ দফা কিংবা সংবিধান সংস্কার কমিশনের কথা বলছে না। বরং তারা দাবি করছে, কখনোই সংবিধান সংস্কারের কথা বলেনি। অথচ তাদের ৩১ দফার প্রথম দফাতেই সংবিধান সংস্কার কমিশন গঠনের প্রতিশ্রুতি রয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
সংবিধান সংশোধন কমিটি নিয়েও কঠোর সমালোচনা করেন নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, শেখ হাসিনা যেভাবে সংবিধান সংশোধনের নামে প্রহসন করেছিলেন, তার পরিণতি আজ তিনি দিল্লিতে অবস্থান করে ভোগ করছেন। একই পথে না হাঁটার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “সংবিধান সংশোধনের নামে এ ধরনের প্রহসন বাংলাদেশের জনগণ মেনে নেবে না। সংবিধান সংস্কার করতে হবে। যদি আপনারা সংস্কারের রাজি না হন, আমরা নতুন সংবিধানের দাবি উঠাব, আমরা নতুন গণপরিষদ নির্বাচনের দাবি তুলব। ভুলে গেলে চলবে না, ঐকমত্য কমিশনে আপনারা ঐকমত্য হয়েছিলেন গণভোটের পক্ষে, সংবিধান সংস্কারের পক্ষে।”
বরিশালের উন্নয়ন প্রসঙ্গ টেনে এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, এই অঞ্চলে কর্মসংস্থানের অভাব রয়েছে। জীবিকার তাগিদে অনেক মানুষকে ঢাকায় গিয়ে বসবাস করতে হচ্ছে। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, বিএনপি তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে ১৮ মাসে এক কোটি কর্মসংস্থান তৈরির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। একই সঙ্গে তিনি বলেন, শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক বরিশালের মানুষের ভূমি ও অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, আর ২০২৪ সালের তরুণ প্রজন্ম নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।
সরকারের পাঁচ মাসের কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, কর্মসংস্থান নয়, বরং চাঁদাবাজদের জন্য সুযোগ তৈরি হয়েছে। তার অভিযোগ, “চাঁদাবাজি নিশ্চিত হয়েছে। কর্মসংস্থান নিশ্চিত হয়েছে চাঁদাবাজদের, ছাত্রদলের, যুবদলের, শ্রমিক দলের, কৃষক দলের। সাধারণ মানুষের কোনো কর্মসংস্থান নিশ্চিত হয় নাই।”
নাহিদ ইসলাম বলেন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিদ্যুৎ খাতের উন্নয়ন, সীমান্ত নিরাপত্তা, চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি দমন, দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং বৈষম্যহীন গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছিল। সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে আবারও সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে রাজপথে আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি। তার ভাষায়, জুলাই বিপ্লবে যারা জীবন দিয়েছেন, তাদের আত্মত্যাগ কোনোভাবেই বৃথা যেতে দেওয়া হবে না।
সমাবেশে ১৮ দলীয় ঐক্যের কেন্দ্রীয় নেতারাও বক্তব্য দেন। এর আগে বরিশাল বিভাগের বিভিন্ন জেলা থেকে হাজার হাজার নেতাকর্মী কেন্দ্রীয় ঈদগাহ মাঠে এসে সমাবেশে যোগ দেন।