
যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যুদ্ধবিরতির স্পর্শকাতর আলোচনা চলার সময় প্রতিনিয়ত মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে ইরানি প্রতিনিধি দলকে। পরমাণু ও সংঘাত ইস্যুতে ওয়াশিংটনের সাথে বৈঠকের প্রতি মুহূর্তে বোমা হামলার চরম আতঙ্ক তাড়া করত বলে চাঞ্চল্যকর এই তথ্য প্রকাশ করেছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশেষ প্রতিনিধি স্টিভ উইটকফের সাথে এক মুখোমুখি আলোচনার স্মৃতি চারণ করে সোমবার (২০ জুলাই) দেশটির রাষ্ট্রীয় মেহর নিউজ এজেন্সিকে আরাগচি বলেন,
"আমি উইটকফকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, আপনি কখনো এমন কোনো আলোচনায় অংশ নিয়েছেন, যেখানে প্রতি মুহূর্তে মনে হয়েছে, যেকোনো সময় পুরো বৈঠকটি বোমা হামলায় ধ্বংস হয়ে যেতে পারে? ফোনে কথা বলার সময় কি কখনো এমন অনুভূতি হয়েছে যে, হয়তো এটাই শেষ কথা? পরিবারের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে কি কখনো মনে হয়েছে এটিই হয়তো তাদের সঙ্গে শেষবারের মতো কথা?"
ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও দাবি করেন, ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের একের পর এক সামরিক হুমকি সত্ত্বেও কোনো অবস্থাতেই নতিস্বীকার করেনি তেহরান। ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ পুরোপুরি শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার অন্যায্য দাবি দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেছিল ইরান। মূলত টেবিলের আলোচনায় নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি করতে ব্যর্থ হয়েই যুক্তরাষ্ট্র একপাক্ষিক যুদ্ধের পথ বেছে নেয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
আরাগচি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন,
"আপনাদের আলোচনা করতে হবে। হুমকি দিয়ে বা প্রলোভন দেখিয়ে আমাদের নড়ানো যাবে না।"
ইরানের এই অটল অবস্থানের কারণেই আমেরিকা ও ইসরায়েলকে পরবর্তীতে সামরিক আগ্রাসনের পথ বেছে নিতে হয়েছে জানিয়ে তিনি জোর দিয়ে বলেন, ১২ দিনব্যাপী সেই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে দিনশেষে ইরানই জয় লাভ করেছে।
সামরিক শক্তি প্রদর্শন করে তেহরানকে বশ্যতা স্বীকার করানোর মার্কিন চিন্তাধারাকে পুরোপুরি অবাস্তব বলে উড়িয়ে দেন ইরানের পররাষ্ট্র প্রধান। চলতি বছরের গত জানুয়ারিতে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে জোরপূর্বক আটক করে যেভাবে ওয়াশিংটন সরকার পতন ঘটিয়েছিল, তার উদাহরণ দিয়ে তিনি স্পষ্ট করেন—ইরান কখনো ভেনেজুয়েলা নয়, কারণ এখানে রাষ্ট্রের ক্ষমতা একক কোনো ব্যক্তির ওপর নির্ভরশীল নয়।
তিনি দৃঢ়তার সাথে ব্যাখ্যা করেন, ইরানের মূল শাসন ও ক্ষমতা কাঠামো বহুস্তরে সাজানো এবং একটি সুসংগঠিত ঐক্যের মাধ্যমে পরিচালিত। ফলে শীর্ষ স্তরের যেকোনো একজন নেতাকে সরিয়ে দিলেও পুরো রাষ্ট্রযন্ত্র ভেঙে পড়া অসম্ভব।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে মধ্যস্থতাকারীদের সাহায্যে হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তিটি কার্যত ভেস্তে যাওয়ার পর পরই এই বিস্ফোরক সাক্ষাৎকারটি জনসম্মুখে এলো। এদিকে সোমবার টানা নবম দিনের মতো ইরানের অভ্যন্তরে জোরদার সামরিক অভিযান চালিয়েছে মার্কিন বিমান বাহিনী। এই পাল্টাপাল্টি হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের তিন সেনা সদস্য নিহতের খবর নিশ্চিত করেছে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম)। পাশাপাশি কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে আন্তর্জাতিক জ্বালানি ও বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিয়ে নতুন করে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।