
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো একটি ভুয়া তথ্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। ভারতের একটি অজ্ঞাত এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে ছড়ানো একটি মিথ্যা উদ্ধৃতি মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ইসরাইলি গণমাধ্যম, রাজনীতিবিদ এবং পরে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক মহলেও ছড়িয়ে পড়ে।
এমনকি ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও নিজের বক্তৃতায় ওই দাবিকে ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির ইচ্ছার প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করেন। পরে দাবিটি ভুয়া প্রমাণিত হলে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক হাস্যরসের সৃষ্টি হয়।
গত ৫ আগস্ট ভারতের একটি এক্স অ্যাকাউন্টে দাবি করা হয়, ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমাদ ভাহিদি বলেছেন—যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের কাছে পারমাণবিক অস্ত্র থাকা পর্যন্ত ইরানও পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা চালিয়ে যাবে।
পোস্টটির সঙ্গে আহমাদ ভাহিদির একটি ছবি এবং পারমাণবিক বিস্ফোরণের একটি এআই-তৈরি ছবি দেওয়া হয়। তবে ভাহিদি এমন কোনো বক্তব্য দিয়েছেন—এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। একইভাবে, ওই দাবির মাধ্যমে ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করেছে—এমন কোনো প্রমাণও পাওয়া যায়নি।
পোস্টটি প্রকাশের দুই ঘণ্টার মধ্যেই ভারতের আরেকটি অ্যাকাউন্টে কথিত বক্তব্যটির হিন্দি অনুবাদ প্রকাশ করা হয়। এরপর ‘মোসাদ কমেন্টারি’ নামে একটি ইসরাইলি অ্যাকাউন্ট দাবিটি আরও ছড়িয়ে দেয়। অ্যাকাউন্টটির নাম ইসরাইলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের সঙ্গে মিল থাকলেও এর সঙ্গে মোসাদের কোনো নিশ্চিত সম্পর্ক নেই।
এরপর ইসরাইলের চ্যানেল ১৪ কথিত বক্তব্যটি প্রচার করে। তারা এটিকে ইরানের পারমাণবিক বোমা তৈরির প্রথম প্রকাশ্য স্বীকারোক্তি হিসেবে উপস্থাপন করে। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ছেলে ইয়াইর নেতানিয়াহুও দাবিটি ছড়িয়ে দেন। তিন ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে বিষয়টি পৌঁছে যায় প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বক্তৃতায়।
যুক্তরাষ্ট্রেও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে ওই দাবি। ট্রাম্প প্রশাসনের জাতিসংঘে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজ দাবিটি পুনরায় পোস্ট করে বলেন, ইরান অবশেষে এমন একটি বিষয় স্বীকার করছে, যা বহু বছর ধরেই স্পষ্ট। রিপাবলিকান সিনেটর রিক স্কটও দাবিটি শেয়ার করেন। পরে ফক্স নিউজও এটি সম্প্রচার করে।
তবে পরবর্তী সময়ে দাবিটির সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। একপর্যায়ে মাইক ওয়াল্টজ তার পোস্টটি এক্স থেকে সরিয়ে দেন। ফক্স নিউজও পরে জানায়, কথিত উদ্ধৃতিটি ‘যাচাইহীন ও ভুল’ এবং এ নিয়ে তারা দুঃখ প্রকাশ করেছে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই ভাইরাল দাবিটিকে ‘ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধে মিথ্যার বন্যা’-এর একটি উদাহরণ হিসেবে প্রত্যাখ্যান করেন। তেহরান বরাবরই দাবি করে আসছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ ও বেসামরিক উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ঘটনাটি দেখিয়েছে কীভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো একটি ভুয়া দাবি বিভিন্ন অ্যাকাউন্ট, টেলিভিশন চ্যানেল ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের মাধ্যমে বারবার প্রচারিত হয়ে শেষ পর্যন্ত সত্য বলে মনে হতে পারে। এই প্রক্রিয়াকে ‘ন্যারেটিভ লন্ডারিং’ বলা হয়। অর্থাৎ, একটি মিথ্যা তথ্যকে বিভিন্ন উৎসের মাধ্যমে ঘুরিয়ে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়, যাতে একপর্যায়ে সেটিকে বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে হয়।