
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানে দক্ষিণ কোরিয়া অংশ না নেওয়ায় দেশটির সঙ্গে যৌথ সামরিক মহড়া ‘উল্লেখযোগ্যভাবে কমানোর’ ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একই সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের সঙ্গে নিজের ‘খুব ভালো সম্পর্কের’ কথাও তুলে ধরেছেন তিনি।
রোববার (১৬ আগস্ট) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার যৌথ সামরিক মহড়া অত্যন্ত ব্যয়বহুল। এসব মহড়ার বড় অংশের খরচ যুক্তরাষ্ট্রই বহন করে। পাশাপাশি তার দাবি, এই মহড়াগুলো উত্তর কোরিয়ার প্রতি এমন একটি বার্তা দেয়, যা ‘অনুপযুক্ত ও বৈরী’।
তবে দক্ষিণ কোরিয়া জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নির্ধারিত যৌথ সামরিক মহড়া পূর্বনির্ধারিত সূচি অনুযায়ীই অনুষ্ঠিত হবে।
ট্রাম্প তার পোস্টে জানান, সম্প্রতি তিনি দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্টকে ইরানকে ‘পরমাণু অস্ত্রমুক্ত’ করার মার্কিন প্রচেষ্টায় যোগ দেওয়ার বিষয়ে জানতে চেয়েছিলেন। তবে সিউল এতে রাজি হয়নি বলে জানান তিনি।
ট্রাম্প লেখেন, দক্ষিণ কোরিয়াকে তিনি জিজ্ঞেস করেছিলেন, তারা ইরানের পরমাণু কর্মসূচি বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রচেষ্টায় অংশ নিতে চায় কি না। জবাবে তারা ‘না, ধন্যবাদ’ বলেছে।
যদিও ট্রাম্প নিজেই স্বীকার করেছেন, ইরানের বিষয়টি যৌথ সামরিক মহড়ার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত নয়।
যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার বার্ষিক সামরিক মহড়া সোমবার শুরু হওয়ার কথা ছিল। ট্রাম্প বলেন, মহড়া বাতিল করার জন্য তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। তবে ভবিষ্যতে এসব মহড়ার পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি।
গত সপ্তাহে মার্কিন ও দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক কর্মকর্তারা ‘উলচি ফ্রিডম শিল্ড’ মহড়ার ঘোষণা দেন। ১১ দিনব্যাপী এই মহড়ায় প্রায় ১৮ হাজার দক্ষিণ কোরীয় সেনার অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন, মহড়ার পরিসর আগের বছরগুলোর কাছাকাছিই থাকবে।
উত্তর কোরিয়াকে নিয়ে নতুন হিসাব
ট্রাম্পের এই ঘোষণার এক দিনেরও কম সময় আগে ২০১৯ সালে কিম জং উনের সঙ্গে তোলা নিজের একটি পুরোনো ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেন তিনি। ছবিটি নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে ট্রাম্প বলেন, ছবিতে দুজনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের চিত্র ফুটে না উঠলেও তারা ‘দারুণ বন্ধু’।
বিশ্লেষকদের মতে, দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে সামরিক মহড়া কমানোর সিদ্ধান্তের পেছনে উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে ট্রাম্পের আগ্রহও থাকতে পারে।
সিউলের ইহওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক লেইফ-এরিক ইজলি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার যৌথ সামরিক মহড়া দুই দেশের বাহিনীকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত রাখতে গুরুত্বপূর্ণ। মহড়া কমিয়ে দিলে দুই দেশের সামরিক সমন্বয় দুর্বল হতে পারে, দক্ষিণ কোরিয়ার নিজস্ব প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর প্রক্রিয়া ধীর হয়ে যেতে পারে এবং এশিয়ায় সম্ভাব্য সংঘাত প্রতিরোধের সক্ষমতাও কমে যেতে পারে।
তার মতে, মহড়া কমানোর ফলে যে অর্থ সাশ্রয় হবে, তা তুলনামূলকভাবে সামান্য। এর বিপরীতে উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়নে এর সুফল পাওয়ারও কোনো নিশ্চয়তা নেই।
উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা
যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার যৌথ সামরিক মহড়া শুরুর কয়েক দিন আগে দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও জাপান উত্তর কোরিয়ার দ্বিতীয় ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা শনাক্ত করে।
চলতি মাসেই উত্তর কোরিয়া জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালিয়েছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গত শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্র-দক্ষিণ কোরিয়ার যৌথ মহড়াকে ‘আগ্রাসী যুদ্ধের মহড়া’ বলে নিন্দা করে।
এদিকে রাশিয়ার ইউক্রেন যুদ্ধে উত্তর কোরিয়ার সেনা মোতায়েনের বিষয়টিও যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক কর্মকর্তারা যৌথ সংবাদ সম্মেলনে উল্লেখ করেছেন। মার্কিন সামরিক বাহিনীর মুখপাত্র রায়ান ডোনাল্ড বলেন, উত্তর কোরিয়ার সেনারা যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফিরে এলে তাদের সম্ভাব্য হুমকি মোকাবিলার বিষয়টি প্রশিক্ষণ পরিকল্পনায় বিবেচনায় রাখা হয়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়ায় বর্তমানে প্রায় ২৮ হাজার ৫০০ মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে।
২০১৮ সালেও মহড়া স্থগিত করেছিলেন ট্রাম্প
দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে যৌথ সামরিক মহড়া কমানোর ক্ষেত্রে ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্ত এবারই প্রথম নয়। ২০১৮ সালে কিম জং উনের সঙ্গে পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ নিয়ে আলোচনার সময় তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার যৌথ সামরিক মহড়া পুরোপুরি স্থগিত করেছিলেন।
সে সময় ট্রাম্প মহড়াগুলোকে উত্তর কোরিয়ার প্রতি ‘উসকানিমূলক’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেছিলেন, ‘যুদ্ধের মহড়া’ বন্ধ করলে যুক্তরাষ্ট্র বিপুল অর্থ সাশ্রয় করতে পারবে।
২০২০ সালে করোনা মহামারির সময়ও এসব সামরিক মহড়ার পরিসর কমানো হয়েছিল।
ট্রাম্পের সর্বশেষ বক্তব্য দক্ষিণ কোরিয়ার জন্য একই সঙ্গে আশা ও উদ্বেগ তৈরি করেছে। একদিকে সিউল দীর্ঘদিন ধরে ট্রাম্পকে উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে আলোচনায় বসার আহ্বান জানিয়ে আসছে। ফলে কিম জং উনের সঙ্গে নিজের সম্পর্কের কথা ট্রাম্প উল্লেখ করায় নতুন করে কূটনৈতিক আলোচনার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানে সরাসরি সামরিক বা সরবরাহগত সহায়তা দিতে দক্ষিণ কোরিয়ার অনাগ্রহে ট্রাম্প অসন্তুষ্ট—এমন বার্তাও স্পষ্ট হয়েছে।
জাপান, ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যসহ অন্যান্য মিত্র দেশ ইরান সংঘাতে যুক্ত হতে অনীহা দেখানোয় ট্রাম্প তাদেরও সমালোচনা করেছেন।
যুদ্ধ শেষ করার উদ্যোগ সিউলের
এরই মধ্যে গত সপ্তাহে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধ শেষ করার বিষয়ে আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছেন। ১৯৫৩ সালে যুদ্ধবিরতি চুক্তি হলেও দুই কোরিয়ার মধ্যে কার্যত যুদ্ধ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয়নি।
ট্রাম্প অতীতেও একাধিকবার অভিযোগ করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ কোরিয়াকে নিরাপত্তা দেওয়ার বিনিময়ে যথেষ্ট সুবিধা পাচ্ছে না। দক্ষিণ কোরিয়ায় মার্কিন সেনা মোতায়েনের সংখ্যা এবং এ জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় নিয়েও তিনি অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
তবে সিউলের কাছে মার্কিন সেনা উপস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সামরিক জোটের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। ফলে ট্রাম্পের সর্বশেষ ঘোষণা ওয়াশিংটন-সিউল সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
দুই দেশের মধ্যে টানাপোড়েন কমাতে চলতি বছরের শুরুতে দক্ষিণ কোরিয়া যুক্তরাষ্ট্রে ৩৫০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে। অন্যদিকে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ং গত বছর ট্রাম্পকে ‘শান্তি প্রতিষ্ঠাকারী’ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন।
সূত্র: বিবিসি