
আগামী ছয় মাসে তীব্র এল নিনোর প্রভাবে বিশ্বজুড়ে অতিরিক্ত তাপমাত্রাজনিত কারণে চার লাখ ৫০ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছেন জলবায়ু বিজ্ঞানীরা। জলবায়ু সংকটের কারণে ইতোমধ্যে যে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে, তার সঙ্গে এল নিনোর অতিরিক্ত উত্তাপ যুক্ত হয়ে এই মৃত্যুর সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
ইন্দোনেশিয়া থেকে ভারত, নাইজেরিয়া থেকে যুক্তরাষ্ট্র—বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। শুধু তীব্র গরমই নয়, এল নিনোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট খরা, দাবানল ও বন্যার কারণেও আরও বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটতে পারে বলে ধারণা করছেন গবেষকরা।
যেসব অঞ্চলে প্রাণহানির ঝুঁকি বেশি
আঞ্চলিক পর্যায়ে তাপজনিত সম্ভাব্য মৃত্যুর সংখ্যা হিসাব করেছেন গবেষকেরা। তাঁদের মতে, এই পূর্বাভাসের মাধ্যমে কোন কোন এলাকায় আগাম সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হলে মানুষের জীবন রক্ষা করা সম্ভব হবে, তা চিহ্নিত করা যেতে পারে।
এ ধরনের ব্যবস্থার মধ্যে থাকতে পারে আরও উন্নত তাপমাত্রা পূর্বাভাস ব্যবস্থা, মানুষের নিরাপদে আশ্রয় নেওয়ার জন্য শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কেন্দ্র স্থাপন, প্রচণ্ড গরমের সময়ে চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোতে অতিরিক্ত জনবল নিয়োগ এবং বাইরে কাজ করা শ্রমিকদের জন্য প্রয়োজনীয় সুরক্ষা নিশ্চিত করা।
প্রত্যাশিত চূড়ায় পৌঁছানোর আগেই রেকর্ড তাপ
বিশ্বের তাপমাত্রা বাড়িয়ে চলা বর্তমান এল নিনো সোমবার এ ধরনের ঘটনার ইতিহাসে সর্বোচ্চ তাপমাত্রার রেকর্ড ভেঙেছে। বিশেষ করে, এল নিনো প্রত্যাশিত সর্বোচ্চ মাত্রায় পৌঁছানোর কয়েক মাস আগেই এই রেকর্ড তৈরি হয়েছে।
আগের এল নিনো ঘটনাগুলোর তুলনায় এবারের তাপমাত্রা এতটাই বেশি যে বিজ্ঞানীরা এটিকে ‘বিস্ময়কর’ এবং ‘গডজিলা-স্তরের’ বলে বর্ণনা করেছেন।
এল নিনো একটি প্রাকৃতিক জলবায়ুগত ঘটনা হলেও বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাবে এর তীব্রতা আরও বেড়ে যেতে পারে।
‘সংখ্যাটি এত বড় যে অনুভূতিশূন্য মনে হতে পারে’
এই প্রতিবেদনের সহলেখক এবং শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট ল্যাবের সহপ্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক মাইকেল গ্রিনস্টোন বলেন, ‘চার লাখ ৫১ হাজার মানুষের এই সংখ্যাটা এতটাই বড় যে এটা অনুভূতিশূন্য মনে হতে পারে। তবে এর মধ্যে আছেন মা-বাবা এবং সন্তান, দাদা-দাদি এবং প্রতিবেশী, কর্মস্থলে যাওয়া মানুষ, পরিবারের যত্ন নেওয়া মানুষ, নিজেদের জীবনযাপন করা মানুষ।’
সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময়ের জন্য এই মৃত্যুর পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। ওই সময়সীমার শেষ পর্যায় বর্তমান তাপমাত্রার পূর্বাভাসের সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে ২০২৭ সালের জুন বা জুলাই পর্যন্ত তাপজনিত মৃত্যুর উচ্চহার অব্যাহত থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
আগামী ছয় মাসে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় দেশ নাইজেরিয়া, ইন্দোনেশিয়া, সুদান, ভারত ও ব্রাজিলের।
তালিকায় যুক্তরাষ্ট্রও
সম্ভাব্যভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ২০টি দেশের তালিকায় রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রও। দেশটিতে অতিরিক্ত তিন হাজার ৫০০ তাপজনিত মৃত্যুর পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া আফ্রিকার সাহেল অঞ্চল এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকাও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এখনই প্রস্তুতির আহ্বান
ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্কলে শাখার এই প্রতিবেদনের আরেক সহলেখক ড. তাম্মা কার্লেটন বলেন, ‘জরুরি প্রতিক্রিয়া বাড়ানো এবং আমাদের প্রচেষ্টাকে আরো সঠিকভাবে লক্ষ্যবস্তু করতে পারলে এই বছর অনেক প্রাণ বাঁচানো সম্ভব। তবে ২০ বছর পর, যখন আজকের চরম তাপমাত্রাই স্বাভাবিক হয়ে যাবে, তখন আমরা যেন ক্রমাগত জরুরি অবস্থায় না থাকি। ভবিষ্যতে প্রাণ বাঁচাতে পারে এমন সরঞ্জাম নকশা, স্থাপন এবং মূল্যায়নের জন্য আমাদের এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে।’
২৪ হাজারের বেশি অঞ্চলের তথ্য বিশ্লেষণ
বিশ্বের ২৪ হাজার ৩৭৮টি অঞ্চলে তাপমাত্রা ও অতিরিক্ত তাপজনিত মৃত্যুর মধ্যে মাসভিত্তিক সম্পর্ক অনুসরণকারী পর্যালোচিত একটি পদ্ধতি ব্যবহার করে এই পূর্বাভাস তৈরি করা হয়েছে।
এর সঙ্গে আগামী মাসগুলোতে এল নিনোর কারণে তাপমাত্রা আরও বাড়তে পারে—এমন পূর্বাভাসও যুক্ত করা হয়েছে। ১৯৯৬ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত সময়ের গড় মাসিক তাপজনিত মৃত্যুর সংখ্যাকে এই হিসাবের ভিত্তি হিসেবে ধরা হয়েছে।
তথ্য সূত্র: রয়টার্স