
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের আসন্ন যুক্তরাষ্ট্র সফরকে ঘিরে ওয়াশিংটনে বড় ধরনের রাষ্ট্রীয় আয়োজন করছে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন। প্রায় এক দশক পর যুক্তরাষ্ট্র সফরে আসছেন শি। ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে এটি হবে দুই নেতার তৃতীয় দ্বিপক্ষীয় বৈঠক।
শিকে স্বাগত জানাতে অ্যান্ড্রুজ বিমানঘাঁটিতে নিজেই উপস্থিত থাকবেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। এ ছাড়া হোয়াইট হাউসে প্রায় ৫০০ সামরিক সদস্যের অংশগ্রহণে সামরিক ফ্লাইওভার, বিশেষ নৈশভোজ এবং প্রদর্শনীর আয়োজন রাখা হয়েছে।
মিত্রদেরও ছাড়িয়ে যাচ্ছে আয়োজন
এশিয়া ট্রাস্টের গবেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের কোনো মিত্র দেশের নেতার জন্যও এ ধরনের সামরিক ও প্রাতিষ্ঠানিক আনুষ্ঠানিকতার আয়োজন করা হয়নি।
চীন যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বী হওয়া সত্ত্বেও শি জিনপিংয়ের সফরকে কেন্দ্র করে এমন ব্যাপক আয়োজনকে নজিরবিহীন হিসেবে দেখছেন তারা।
দুই দেশের সম্পর্কের নানা টানাপোড়েনের মধ্যেও শিকে দেওয়া এই রাষ্ট্রীয় মর্যাদা আসন্ন বৈঠকের গুরুত্বকেই তুলে ধরছে।
মেয়াদ শেষ হচ্ছে বাণিজ্য চুক্তির
ট্রাম্প ও শি জিনপিংয়ের বৈঠকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য হতে পারে দুই দেশের বাণিজ্য সম্পর্ক। এর মধ্যে ২০১৫ সালের অক্টোবরে দক্ষিণ কোরিয়ায় অনুষ্ঠিত দুই নেতার বৈঠকের পর করা একটি বাণিজ্য চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পথে।
ওই বৈঠকের পর ওয়াশিংটন চীনা পণ্যের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ স্থগিত করেছিল। পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে বেইজিং বিরল খনিজ রপ্তানির ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞা কিছুটা শিথিল করে।
চুক্তিটির বর্তমান মেয়াদ চলতি বছরের নভেম্বরে শেষ হবে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের বাণিজ্য ঘাটতি ৯১ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। পাশাপাশি কৃষি ও অশুল্ক বিষয়গুলো নিয়ে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ফাঁকে দুই পক্ষের মধ্যে অনুষ্ঠিত বৈঠকও আশানুরূপ ফল দেয়নি।
এ কারণে পুরোনো চুক্তি নবায়ন করে নতুন সমঝোতায় পৌঁছানোর বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
ট্রাম্প চীনা পণ্যের ক্ষেত্রে কঠোর বাণিজ্যনীতি অব্যাহত রাখতে চাইছেন। অন্যদিকে চীন যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনে আগ্রহী। ফলে বাণিজ্য ইস্যুতে দুই দেশের স্বার্থের পার্থক্য বৈঠকে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
এআই নিয়ে প্রতিযোগিতা ও সহযোগিতার সম্ভাবনা
বাণিজ্যের বাইরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তিও ট্রাম্প-শি বৈঠকের গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য হতে পারে।
এআই প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণ এবং এই খাতে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রতিযোগিতা ইতোমধ্যেই বৈশ্বিক পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে। সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্সসহ কয়েকজন মার্কিন আইনপ্রণেতা ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ‘সুপার ইন্টেলিজেন্স’ এবং এআই প্রযুক্তির ওপর বৈশ্বিক বিরতির বিষয়ে একটি চুক্তির দাবি জানিয়েছেন।
তবে ট্রাম্প এআই খাতে চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতাকে ভিন্নভাবে দেখছেন। তার কাছে এই প্রযুক্তিতে চীনকে পেছনে ফেলা যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক শক্তি এবং বৈশ্বিক প্রভাব ধরে রাখার অন্যতম প্রধান হাতিয়ার।
তবুও দুই দেশের মধ্যে এআইসহ কিছু ক্ষেত্রে সহযোগিতার সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকেরা।
আলোচনায় থাকবে তাইওয়ানও
ট্রাম্প ও শির আলোচনায় তাইওয়ান ইস্যুও বিশেষ গুরুত্ব পেতে পারে।
মার্কিন কংগ্রেসে কয়েক বিলিয়ন ডলারের তাইওয়ান অস্ত্র বিক্রির একটি প্রস্তাব পাস হলেও তাতে এখনো চূড়ান্ত অনুমোদন দেননি ট্রাম্প। চীনের সঙ্গে আলোচনার ক্ষেত্রে এই অস্ত্র বিক্রির সিদ্ধান্তকে তিনি দর-কষাকষির একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
চীন তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ বলে মনে করে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তাইওয়ানের কাছে অস্ত্র বিক্রির বিষয়টি বরাবরই বেইজিংয়ের উদ্বেগের অন্যতম কারণ।
শি জিনপিংয়ের এবারের সফরে ট্রাম্পের কাছ থেকে তাইওয়ানের কাছে অস্ত্র বিক্রির সিদ্ধান্ত বিলম্বিত করা কিংবা তা বাতিলের বিষয়ে কোনো প্রতিশ্রুতি পাওয়ার প্রত্যাশা রয়েছে চীনের।
সংঘাত এড়াতে আগ্রহী ট্রাম্প
ট্রাম্পের মন্ত্রিসভার সদস্য এবং তার সমর্থকদের একটি বড় অংশ চীনের প্রতি সন্দিহান। তবে দুই পরাশক্তির মধ্যে সরাসরি সংঘাত এড়িয়ে চলতে ট্রাম্প নিজে আগ্রহী বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ফলে বাণিজ্য, এআই ও তাইওয়ান নিয়ে মতপার্থক্য থাকলেও শি জিনপিংয়ের এই সফরে দুই দেশের মধ্যে সমঝোতার সম্ভাব্য ক্ষেত্রগুলো খুঁজে বের করার চেষ্টা থাকতে পারে।
প্রায় এক দশক পর শির ওয়াশিংটন সফর এবং তাকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের নজিরবিহীন রাষ্ট্রীয় আয়োজন তাই দুই পরাশক্তির সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনাকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
তথ্যসূত্র: বিবিসি