
ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভসহ বিভিন্ন শহরে লক্ষ্যভিত্তিক হামলা চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে রাশিয়া। একই সঙ্গে বিদেশি নাগরিক, বিশেষ করে কূটনীতিকদের ইউক্রেন ছাড়ার বা দেশটিতে ভ্রমণ না করার সতর্কবার্তা দিয়েছে মস্কো।
এমন উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যেই রোববার কিয়েভে পৌঁছেছেন জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রেডরিখ ম্যার্ৎজ। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির প্রতি সমর্থন জানাতেই তাঁর এই সফর। তবে ম্যার্ৎজের আগমনের সময়ও রাজধানীতে বিমান হামলার সতর্কসংকেত শোনা যায় এবং বিভিন্ন এলাকায় বিস্ফোরণের শব্দ পাওয়া যায়।
সফরকালে ইউক্রেনের জন্য নতুন সামরিক ও জ্বালানি সহায়তার ঘোষণা দেওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের ড্রোন যৌথভাবে উৎপাদনের একটি চুক্তি চূড়ান্ত করার কথা রয়েছে।
কিয়েভ ছাড়তে বিদেশিদের সতর্ক করল মস্কো
রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় শনিবার এক বিবৃতিতে জানায়, ইউক্রেনের রাজধানীসহ দেশটির অন্যান্য শহরে সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে পরিকল্পিত ও ধারাবাহিক হামলা চালিয়ে যাবে রুশ বাহিনী।
মস্কোর দাবি, রাশিয়ার বেসামরিক জনগণ ও অবকাঠামোর ওপর ইউক্রেনীয় বাহিনীর কথিত ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের’ জবাব হিসেবেই এসব হামলা চালানো হচ্ছে।
একই বিবৃতিতে বিদেশি নাগরিকদের ইউক্রেনে অবস্থান না করার এবং নতুন করে দেশটিতে ভ্রমণ না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে কূটনৈতিক মিশনে কর্মরত ব্যক্তিদের সতর্ক করে বলা হয়েছে, এই নির্দেশনা উপেক্ষা করে কোনো বিরূপ পরিস্থিতির মুখে পড়লে তার দায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদেরই বহন করতে হবে।
সম্প্রতি কিয়েভের অবকাঠামো লক্ষ্য করে রুশ হামলার মাত্রা বাড়ার কথা জানিয়েছে ইউক্রেন। শনিবারের একটি বিমান হামলায় দিনিপ্রো নদীর ওপর থাকা একটি সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ধারাবাহিক হামলার কারণে প্রায় ৩০ লাখ মানুষের শহর কিয়েভে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। সামনে শীতের তীব্র মাসগুলো থাকায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এ সপ্তাহে বলেছেন, রাশিয়ার ওপর ইউক্রেনের হামলার মূল্য কিয়েভকে দিতে হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও দিতে হবে। রুশ বাহিনী ইউক্রেনের বিভিন্ন স্থাপনায় পরিকল্পিত হামলা চালিয়ে যাবে বলেও তিনি জানিয়েছেন।
এদিকে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে কৃষ্ণসাগরে দুই দেশই একে অপরের শস্যবাহী জাহাজ লক্ষ্য করে হামলা বাড়িয়েছে। একই সময়ে রাশিয়ার তেল শোধনাগারসহ বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ইউক্রেনের গোলাবর্ষণ অব্যাহত রয়েছে। ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় রাশিয়ার সীমান্তবর্তী এলাকাতেও বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি ঘটছে।
তবে বেসামরিক মানুষ ও অবকাঠামোকে ইচ্ছাকৃতভাবে লক্ষ্য করার অভিযোগ দুই পক্ষই অস্বীকার করে আসছে।
রুশ হামলার মধ্যেই কিয়েভে জার্মান চ্যান্সেলর
রুশ হামলার তীব্রতার মধ্যেই জেলেনস্কির প্রতি সমর্থন জানাতে রোববার কিয়েভে পৌঁছান জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রেডরিখ ম্যার্ৎজ। তাঁর আগমনের সময় রাজধানীতে একাধিকবার বিমান হামলার সতর্কসংকেত বাজে। একই সময়ে বিভিন্ন এলাকায় বিস্ফোরণ ও আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সক্রিয় হওয়ার শব্দ শোনা যায়।
জার্মান সরকারের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সফরে ইউক্রেনের জন্য নতুন সহায়তার ঘোষণা দেবেন ম্যার্ৎজ। এর মধ্যে সামরিক খাতে ১০০ কোটি ইউরো বা ১ বিলিয়ন ইউরো এবং জ্বালানি অবকাঠামো পুনর্গঠনে ৩৫ কোটি ইউরো বা ৩৫০ মিলিয়ন ইউরোর সহায়তা রয়েছে। ডলারের হিসাবে এই দুই সহায়তার পরিমাণ যথাক্রমে প্রায় ১১৩ কোটি ও ৩৫ কোটি ডলার।
এ ছাড়া বিভিন্ন ধরনের ড্রোন যৌথভাবে উৎপাদনের বিষয়ে ইউক্রেন ও জার্মানির মধ্যে একটি চুক্তি চূড়ান্ত করার কথা রয়েছে।
‘ইউক্রেন আমাদের সহায়তার ওপর নির্ভর করতে পারে’
কিয়েভ সফরের কারণ ব্যাখ্যা করে ম্যার্ৎজ বলেন, আগামী কয়েক সপ্তাহে ইউক্রেনের সব ধরনের সহায়তা প্রয়োজন। এ কারণেই তিনি কিয়েভে এসেছেন।
রুশ বাহিনী শহর, আবাসিক ভবন ও তাপ সরবরাহকেন্দ্রগুলোতে হামলা চালাচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর সতর্কবার্তা, রাশিয়াকে থামানো সম্ভব না হলে একপর্যায়ে দেশটির যুদ্ধযন্ত্র ইউরোপের দিকেও ঘুরে দাঁড়াতে পারে।
জেলেনস্কিকে নিজের সমর্থনের কথা জানিয়ে ম্যার্ৎজ বলেন, ইউক্রেন জার্মানির সহায়তার ওপর নির্ভর করতে পারে।
এদিকে রোববার সকালে কিয়েভে চারবার বিমান হামলার সতর্কসংকেত বাজে। শহরের বিভিন্ন স্থানে বিস্ফোরণের পাশাপাশি আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সক্রিয় হওয়ার শব্দও শোনা যায়।
কিয়েভের মেয়র ভিতালি ক্লিৎস্কো জানান, রুশ হামলায় দিনিপ্রো নদীর ওপর থাকা নর্দার্ন ব্রিজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেতুটির সড়কপথে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে তিনি জানান। একই হামলায় ওই এলাকার গরম পানি সরবরাহব্যবস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।