
শান্তি আলোচনার উদ্যোগের মধ্যেই ইউক্রেনের বিভিন্ন শহরে নতুন করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে রাশিয়া। বৃহস্পতিবারের এসব হামলায় অন্তত ২০ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে দিনিপ্রো শহরের একটি ব্যস্ত রেলস্টেশনে ড্রোন আঘাত হানলে প্রাণ হারান ১৪ জন। চেরনিহিভ, ক্রেমেনচুক ও রাজধানী কিয়েভেও প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে।
ইউক্রেনের কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে রয়টার্স জানায়, বৃহস্পতিবার চেরনিহিভ ও ক্রেমেনচুক শহরে হামলায় আরও পাঁচজন নিহত হন। রাতে কিয়েভে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় মারা যান একজন। একের পর এক হামলায় দেশজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
ইউক্রেনের প্রধানমন্ত্রী সেরহি কোরেৎস্কি টেলিগ্রামে দেওয়া এক বার্তায় অভিযোগ করেন, রাশিয়া পরিকল্পিতভাবে সাধারণ মানুষকে লক্ষ্যবস্তু করছে। ট্রেন, রেলস্টেশন ও আবাসিক ভবনে হামলার কোনো যুক্তি নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
কিয়েভের সামরিক প্রশাসন জানায়, বৃহস্পতিবার রাত ১১টার কিছু আগে রাজধানীর কয়েকটি এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়। এতে একজন নিহত হন। হামলায় কয়েকটি গুদামে আগুন ধরে যায়। এ ছাড়া দিনিপ্রো নদীর পূর্ব তীরে একটি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এর কয়েক ঘণ্টা আগে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি রাশিয়ার হামলাকে ‘অত্যন্ত নিষ্ঠুর’ বলে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, সবাই যখন উত্তেজনা কমানোর উদ্যোগের অপেক্ষায়, তখনই রাশিয়া হামলা চালাচ্ছে। এটি ইচ্ছাকৃত।
জেলেনস্কি আরও জানান, রাশিয়া নতুন করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে গোয়েন্দা তথ্য পেয়েছে ইউক্রেন। রাশিয়ার হামলা ও ধ্বংসযজ্ঞ বন্ধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে মিত্রদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
এদিকে দক্ষিণ ইউক্রেনের খেরসন অঞ্চলে ছয় দিনের স্থানীয় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় হওয়া এই উদ্যোগের লক্ষ্য রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে থাকা ওলেশকি শহরে মানবিক সহায়তা পৌঁছানো। ২০২২ সালে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার হামলা শুরুর পর থেকে শহরটি যুদ্ধের মধ্যে আটকে রয়েছে।
ইউক্রেন ও রাশিয়া—উভয় পক্ষই জানিয়েছে, ওই এলাকায় মাইন অপসারণের কাজ শেষ হয়েছে। ফলে শহরটিতে ত্রাণ পাঠানোর পাশাপাশি সেখান থেকে চলে যেতে ইচ্ছুক বাসিন্দাদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এই যুদ্ধবিরতিকে কেন্দ্র করে নতুন করে শান্তি আলোচনা শুরুর আশাও তৈরি হয়েছে। তবে এটি কেবল খেরসন অঞ্চলের নির্দিষ্ট এলাকার জন্য প্রযোজ্য।
অন্যদিকে ইউক্রেনের বিভিন্ন এলাকায় রাশিয়ার ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা অব্যাহত রয়েছে। বিশেষ করে রেলপথসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্য করে চালানো হামলায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে অর্থনীতিও। ইউক্রেনের বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থায় ক্ষেপণাস্ত্রের সংকট থাকায় রাশিয়া সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে হামলা বাড়াচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
দিনিপ্রো শহরের প্রধান রেলস্টেশনে একটি যাত্রীবাহী ট্রেন ছাড়ার প্রস্তুতি চলার সময় জেট ইঞ্জিনচালিত একটি ড্রোন প্ল্যাটফর্মে আঘাত হানে বলে জানিয়েছে ইউক্রেনের রাষ্ট্রীয় রেল সংস্থা উক্রজালিজনিতসিয়া। হামলার পর প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে পড়ে মরদেহ ও বিস্ফোরণের ধাতব টুকরা। মেঝেতে জমে থাকা রক্তের মধ্যেই পুলিশ মরদেহ সরিয়ে নেয়। এ সময় বিমান হামলার সতর্কসংকেত বাজছিল।
স্টেশনের নিচে ভূগর্ভস্থ আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করছিলেন ৬৭ বছর বয়সী স্বিতলানা শেরবাক। তিনি বলেন, ‘আর এসব কেন? তারা আসলে কী অর্জন করতে চাইছে? আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।’
দিনিপ্রোর আরেকটি হামলায় শিক্ষার্থীদের একটি আবাসিক ভবনে আগুন ধরে যায়। আঞ্চলিক গভর্নর ওলেক্সান্দর হানঝা জানান, বৃহস্পতিবারের হামলায় শহরটির তিন লাখ ৫০ হাজার পরিবার বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়ে। বেসামরিক মানুষকে লক্ষ্য করে হামলার অভিযোগ অবশ্য অস্বীকার করেছে মস্কো।
উত্তর ইউক্রেনের চেরনিহিভ শহরের একটি ব্যস্ত সড়কে ড্রোন হামলায় দুই কিশোরী নিহত হয়েছে। আহত হয়েছেন আরও ২৩ জন, যাঁদের মধ্যে চারটি শিশু রয়েছে। শহরটির সামরিক প্রশাসনের প্রধান দিমিত্রো ব্রিঝিনস্কি বলেন, হামলার শিকার ব্যক্তিরা সাধারণ মানুষ ছিলেন। তাঁরা প্রতিদিনের মতো কাজে যাচ্ছিলেন।
মধ্য ইউক্রেনের ক্রেমেনচুক শহরে আবাসিক ভবনে হামলায় তিনজন নিহত ও ৩২ জন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন আঞ্চলিক গভর্নর। এতে কয়েকটি ব্যক্তিগত ভবনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এদিকে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় জাপোরিঝঝিয়া শহরে তিনটি পৃথক ড্রোন হামলায় কয়েকটি বাস ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে আহত হয়েছেন ছয়জন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের সবচেয়ে প্রাণঘাতী সংঘাত বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় শান্তি আলোচনা শুরুর চেষ্টা চলছে। আগামী মাসে ইউক্রেন, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আবারও ত্রিপক্ষীয় আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে রাশিয়ার ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়াতে মিত্র দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন জেলেনস্কির শীর্ষ উপদেষ্টা কিরিলো বুদানভসহ ইউক্রেনের কর্মকর্তারা। তাঁদের মতে, রাশিয়ার হামলা বন্ধে আন্তর্জাতিক চাপ আরও জোরদার করা প্রয়োজন।